রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রভাবশালী নেতা আজিজুর রহমান মোছাব্বিরকে (৪৫) প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় বড় ধরণের সাফল্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের ‘প্রধান শুটার’ জিনাত এবং অন্যতম পরিকল্পনাকারী বিল্লালসহ মোট ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। রোববার ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাত ৮টা ২০ মিনিটে কারওয়ান বাজারের স্টার হোটেলের পাশে আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের অন্ধকার গলিতে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা মোছাব্বিরকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘাতকরা মোটরসাইকেলে এসে অতর্কিতে হামলা চালায় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। এই বর্বরোচিত হামলায় মোছাব্বিরের সঙ্গী ও কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদও পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে বিআরবি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত মাসুদ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গোয়েন্দা পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ এবং তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় ঘাতকদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালায়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া শুটার জিনাত ও তার সহযোগীরা ঘটনার অন্তত ২৫ মিনিট আগে স্পটে এসে ওত পেতে ছিল। ডিবি জানায়, গ্রেপ্তারকৃত জিনাত পেশাদার অপরাধী এবং টাকার বিনিময়ে সে এই ‘কিলিং মিশনে’ অংশ নেয়। অন্যদিকে, গ্রেপ্তারকৃত বিল্লাল এই পুরো হত্যাকাণ্ডের ব্লু-প্রিন্ট বা নকশা তৈরি করেছিলেন বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন এবং এর নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
নিহত আজিজুর রহমান মোছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার কারাবরণ করেছেন এবং বিগত সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক মামলা ছিল। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি পুনরায় সক্রিয় হন এবং এলাকায় বেশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম অভিযোগ করেছেন যে, তার স্বামী বেশ কিছুদিন ধরেই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের থেকে প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছিলেন। এই ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বিকেলে এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে জানান, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আতঙ্ক ছড়ানোর হীন উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হতে পারে। তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃত ৪ জনের বাইরে আরও বেশ কয়েকজন এই ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মহাখালী ও তেজগাঁও কেন্দ্রিক প্রভাবশালী কোনো মহলের প্ররোচনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা। পুলিশ ইতোমধ্যে এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নগরবাসীর মনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে প্রধান শুটারসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই ঘটনার জট খুলতে শুরু করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দ্রুতই তারা মামলার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেবেন এবং হত্যার প্রকৃত মোটিভ বা উদ্দেশ্য জাতির সামনে উন্মোচন করবেন।

