রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় নিজ বাসায় ফাতেমা আক্তার লিলি (১৭) নামের এক স্কুলছাত্রীকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরের পর কোনো এক সময়ে দক্ষিণ বনশ্রীর প্রধান সড়কের ‘প্রীতম ভিলা’ নামক একটি আবাসিক ভবনে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত লিলি স্থানীয় রেডিয়েন্ট স্কুলের দশম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। দিনের আলোতে এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
খিলগাঁও থানা পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, লিলিদের আদি বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার বামৈন গ্রামে। তার বাবা সজীব মিয়া বনশ্রী এলাকায় পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন এবং সেখানে তাদের একটি হোটেলের ব্যবসা রয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি জমিজমা সংক্রান্ত জরুরি প্রয়োজনে সজীব মিয়া ও তার স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে যান। বাসায় লিলি তার বড় বোন শোভার সঙ্গেই ছিল। শনিবার দুপুরে শোভা জিমনেসিয়ামে গেলে সেই সুযোগে দুর্বৃত্তরা বাসায় ঢুকে এই হত্যাকাণ্ড চালায়।
হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে নিহতের বড় বোন শোভা অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, তিনি বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জিম থেকে ফিরে বাসার দরজা খোলা দেখতে পান। ভেতরে প্রবেশ করে সবকিছু এলোমেলো অবস্থায় দেখে তার সন্দেহ হয়। একপর্যায়ে ঘরের ভেতরে একটি বড় পাতিলের নিচে লিলিকে কুঁকড়ানো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। প্রথমে ভেবেছিলেন লিলি হয়তো মাথায় আঘাত পেয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে আছে, কিন্তু গায়ের হিজাব সরাতেই দেখেন তার গলার চারপাশে রশি প্যাঁচানো এবং ধারালো বঁটি দিয়ে গলা কাটা হয়েছে।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাদের হোটেলের কর্মচারী মিলনের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে জোরালো সন্দেহ করছে পরিবার। শোভা উল্লেখ করেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে খাবার নেওয়ার জন্য মিলন বাসায় এলে লিলি তার সাথে কিছুটা কড়া ব্যবহার করেছিল। আজ দুপুরেও মিলন খাবার নেওয়ার কথা বলে বাসায় এসেছিল। শোভার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে পূর্ব শত্রুতা বা ক্ষোভের জেরে মিলন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা। তবে লিলিকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় বাড়ির মালিক বা প্রতিবেশীদের কাউকেই পাশে পাননি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তার বোন। পরে এক বন্ধুর সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে ফরাজী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বিকেলের দিকে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং হাসপাতাল থেকে শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক সুরতহালে নিহতের গলায় গভীর ক্ষত ও রশির দাগ পাওয়া গেছে। ওসি বলেন, “হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও মোটিভ এখনো স্পষ্ট নয়। আমরা পরিবারের সন্দেহভাজন ব্যক্তিসহ সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখছি। সিআইডির ফরেনসিক টিম আলামত সংগ্রহ করেছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান শুরু করেছে।”
রাজধানীর একটি জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে স্কুলছাত্রী খুনের এই ঘটনাটি জননিরাপত্তার প্রশ্নে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গৃহপরিচারক বা দোকানের কর্মচারীদের পরিচয় যাচাই ও গতিবিধি নজরদারির গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে এবং এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

