দেশে চলমান লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে অটোগ্যাস খাত। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অটোগ্যাস স্টেশন মালিকদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক সহায়তা এবং নীতিগত সুরক্ষা প্রদানের দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলপিজি আমদানি প্রক্রিয়া দ্রুত স্বাভাবিক করার জোর আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা। শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানী ঢাকার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি সিরাজুল মাওলা বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, এলপিজি অটোগ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে দেশের প্রায় সব স্টেশন এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে লক্ষাধিক এলপিজিচালিত যানবাহনের মালিক ও চালক চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
গ্যাস স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেয়ে অনেক চালক গাড়ি চালানো বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন, যার ফলে গণপরিবহন ও যাত্রীসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে পরিবহন খাতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে দেশের এলপিজি ব্যবহারের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয়, বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর একটি বড় অংশ গৃহস্থালি ও শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত হলেও যানবাহন খাতে অটোগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয় মাত্র ১৫ হাজার মেট্রিক টন, যা মোট ব্যবহারের মাত্র ১০ শতাংশ। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এই সামান্য পরিমাণ গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা। এই ১০ শতাংশ গ্যাসের অভাবে পুরো অটোগ্যাস শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) প্রতি জরুরি অনুরোধ জানিয়ে সিরাজুল মাওলা বলেন, পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রতি মাসে মোট আমদানিকৃত গ্যাসের অন্তত ১০ শতাংশ অংশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অটোগ্যাস স্টেশনগুলোতে সরবরাহ করতে হবে। এই ন্যূনতম সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ দেউলিয়া হয়ে যাবে। দীর্ঘদিন স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় মালিকেরা কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছেন না এবং ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক নতুন উদ্যোক্তা ঋণের চাপে এখন দিশেহারা।
সংকট উত্তরণে সংগঠনটির পক্ষ থেকে ছয় দফা সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—অবিলম্বে এলপিজি আমদানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ও পর্যাপ্ত করতে জরুরি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরবরাহ সীমিত করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া। এ ছাড়া এলপিজি সিলিন্ডার ও অটোগ্যাস স্টেশনের সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
নতুন কোম্পানিগুলোকে আমদানির অনুমতি প্রদান এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রয়কারী অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। সর্বোপরি, বর্তমান সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশন মালিকদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও নীতিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানায় সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ যখন জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের বিকল্প হিসেবে সাশ্রয়ী অটোগ্যাসের দিকে ঝুঁকছে, তখন এই ধরনের সরবরাহ সংকট অত্যন্ত অনভিপ্রেত। এলপিজি অটোগ্যাস কেবল সাশ্রয়ীই নয়, এটি পরিবেশ দূষণ রোধেও সহায়ক। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থেই প্রয়োজন। সরকারের জ্বালানি বিভাগ ও বিইআরসি যদি দ্রুত হস্তক্ষেপ না করে, তবে কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারানোর পাশাপাশি দেশের বিকল্প জ্বালানি খাত দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

