রাজধানী ঢাকার একটি বিশাল অংশে আকস্মিক গ্যাস বিপর্যয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। শীতকালীন চাহিদার তুলনায় এমনিতেই সরবরাহে ঘাটতি ছিল, তার ওপর আমিনবাজার সংলগ্ন তুরাগ নদীর তলদেশে সঞ্চালন লাইনে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি ও পাইপলাইনে পানি ঢুকে পড়ার ঘটনায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি মালবাহী ট্রলারের নোঙরের আঘাতে নদীর তলদেশের পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ছিদ্র দিয়ে পাইপলাইনের ভেতরে নদীর পানি প্রবেশ করায় মেরামত কাজ জটিল হয়ে পড়েছে, যার ফলে রাজধানীর অন্তত সাতটি প্রধান এলাকায় রান্নাসহ সব ধরনের গ্যাসনির্ভর কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত বুধবার, যখন একটি ভারী মালবাহী ট্রলারের নোঙর তুরাগ নদীর তলদেশে স্থাপিত তিতাসের উচ্চচাপ সম্পন্ন গ্যাস পাইপলাইনের ওপর দিয়ে টেনে নেওয়া হয়। এতে পাইপলাইনটির সুরক্ষা কবচ ভেঙে লিকেজ তৈরি হয়। লিকেজ শনাক্ত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ বুধবার রাত থেকেই মেরামত কাজ শুরু করে। তবে নদীর তলদেশে প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে কারিগরি দল দেখতে পায় যে, ফুটো হওয়া স্থান দিয়ে প্রচুর পরিমাণে পানি গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এর ফলে মেরামতের চেয়েও লাইন থেকে পানি অপসারণ করা এখন প্রকৌশলীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস লাইনে পানি ঢুকে পড়ায় চাপের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং চুলায় গ্যাস পৌঁছানোর পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ আজ শুক্রবার এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আমিনবাজার থেকে গাবতলী হয়ে আসা এই প্রধান সঞ্চালন লাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে গাবতলী, আসাদগেট, মোহাম্মদপুর, বসিলা, লালমাটিয়া ও ধানমন্ডিসহ বিশাল এক এলাকায় গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ছুটির দিন হওয়ায় এই দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। অনেক বাড়িতে গতকাল রাত থেকেই চুলা জ্বলছে না। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাস বা ইলেকট্রিক কুকার না থাকায় রান্নার কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা মো. শাহজাহান তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন যে, গত দুই দিন ধরে গ্যাসের চাপ খুব কম ছিল, কিন্তু শুক্রবার সকাল থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ছুটির দিনে পরিবারের সবার জন্য রান্নার বিশেষ আয়োজন থাকে, কিন্তু চুলা না জ্বলায় বাধ্য হয়ে দোকান থেকে নিম্নমানের খাবার বেশি দামে কিনে আনতে হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে ধানমন্ডি ও লালমাটিয়া এলাকায়। ধানমন্ডির বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন জানান, তীব্র শীতের সকালে গরম পানি তো দূরের কথা, নাস্তা তৈরির মতো সামান্য গ্যাসও পাওয়া যায়নি। যাদের সামর্থ্য আছে তারা রাইস কুকার বা ইনডাকশন ওভেনে কাজ চালাচ্ছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য এটি এক অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
তিতাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, পানির নিচে কাজ করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। নদীর স্রোত এবং শীতের কুয়াশার কারণে ডুবুরি দলের কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। তবুও কারিগরি দল নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা যায়। পাইপলাইন থেকে পানি সম্পূর্ণ নিষ্কাশন না করা পর্যন্ত আবাসিক গ্রাহকদের চুলায় স্বাভাবিক চাপ ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। কর্তৃপক্ষ এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিভ্রাটের জন্য গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো জানায়নি তিতাস।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার নদীগুলোর তলদেশ দিয়ে যাওয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি প্রয়োজন। মালবাহী নৌযানগুলোর অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং যেখানে-সেখানে নোঙর ফেলার কারণে বারবার জাতীয় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমান এই সংকটে রাজধানীর রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতে হয়েছে, আর যেগুলোতে এলপিজি ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গ্রাহকদের খাবার সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। শীতের মৌসুমে গ্যাসের এই ঘাটতি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

