আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিরোধে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারে সশস্ত্র দেহরক্ষী বা ‘গানম্যান’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মাওলানা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর) এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিকে সরকারি গানম্যান সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মেহেরপুর-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাসুদ অরুণকেও এই নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হয়েছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদদের জীবননাশের আশঙ্কা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে করা আবেদনের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) লিখিত নির্দেশনা প্রদান করেছে। এর ফলে অতি দ্রুত এই তিন নেতা তাদের ব্যক্তিগত গানম্যান পাবেন। উল্লেখ্য, এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয়জন নেতা এবং দেশের প্রভাবশালী দুই সংবাদপত্রের সম্পাদককেও অনুরূপ নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে গানম্যান নিয়োগের বিষয়টি মূলত ২০০১ সালের ২ ডিসেম্বর জারি করা একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে পরিচালিত হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রটোকল অনুযায়ী নিরাপত্তা পান। তবে এর বাইরে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি যদি নিজের জীবনের নিরাপত্তা বিপন্ন মনে করেন, তবে তাকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কমিশনার বা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করতে হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সেই আবেদনের সত্যতা ও ঝুঁকির মাত্রা পর্যালোচনা করে আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশক্রমে গানম্যান বরাদ্দ দেওয়া হয়।
যদিও ২০০৬ সালে এক নির্দেশনায় নিরাপত্তা হুমকি মূল্যায়নের প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও যৌথ গোয়েন্দা তৎপরতার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল, তবে এবারের বরাদ্দগুলো মূলত ২০০১ সালের মূল নীতিমালার আলোকেই সরাসরি সম্পন্ন করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নির্বাচনী উত্তাপের সময়ে শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে গানম্যান নিয়োগের এই প্রবণতা নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সরকার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন মনে করেন, শুধু একজন গানম্যান দিয়ে প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি একে একটি ‘সাময়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল’ ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। অন্যথায় গানম্যানের উপস্থিতি ব্যক্তির মনে একটি কাল্পনিক বা মিথ্যা নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।”
অন্যদিকে, অপরাধবিজ্ঞানী ও প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গানম্যান প্রদানের বিষয়টি একটি প্রদর্শনমূলক সংস্কৃতিতে পরিণত হওয়া উচিত নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেনের মতে, এটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকলে রাষ্ট্রের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত জনবল সংকটে পড়বে। ব্যারিস্টার জাহিদ রহমানও জোর দিয়ে বলেন যে, স্বচ্ছ মানদণ্ড ছাড়া এই সুবিধা প্রদান করা হলে তা সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) বাহারুল আলম জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে পুলিশের বিশেষ শাখার তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতেই এই গানম্যানগুলো বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ইতিপূর্বে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও আশ্বস্ত করেছিলেন যে, দেশে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও আবেদনের ভিত্তিতে যে কেউ যৌক্তিক কারণে নিরাপত্তা সুবিধা পেতে পারেন।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ। গণসংহতি আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের এই নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে সরকার নির্বাচনী পরিবেশে একটি আস্থার বার্তা দিতে চাইছে। তবে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিরাপত্তার চেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তা তুলনামূলক কম খরচে বেশি কার্যকর হবে।

