ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত পলাতক আসামি ফয়সালসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চাঞ্চল্যকর এই মামলার জট খুলেছে বলে দাবি করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মামলার বিস্তারিত তুলে ধরেন ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জের ধরেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল বলে ডিবি’র তদন্তে উঠে এসেছে।
চার্জশিটভুক্ত ১৭ জন আসামির মধ্যে ১২ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। বাকি ৫ জন এখনও পলাতক রয়েছেন, যাদের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত ফয়সাল অন্যতম। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পলাতক আসামি ফয়সালের একটি ভিডিওবার্তা প্রকাশিত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ডিবি প্রধান বলেন, “পলাতক অবস্থায় যে কেউ বিভ্রান্তি ছড়াতে ভিডিওবার্তা দিতেই পারে, কিন্তু আমাদের কাছে তার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। আইনের হাত থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ তার নেই।”
হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দুপুর সোয়া দুইটার দিকে রাজধানীর পল্টন থানাধীন বিজয়নগর বক্স কালভার্ট রোডে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলার শিকার হন শরিফ ওসমান বিন হাদি। তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে গত ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ নেতা।
ওসমানের ওপর বর্বরোচিত এই হামলার ঘটনায় গত ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। শুরুতে এটি হত্যাচেষ্টার মামলা হিসেবে দায়ের করা হলেও ওসমানের মৃত্যুর পর গত ২০ ডিসেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্দিক আজাদ মামলাটিতে দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা) ধারা সংযোজনের নির্দেশ দেন। তদন্তে জানা গেছে, এটি কোনো তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল ছিল না, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বেশ কিছুদিন ধরে ছক কষছিল।
সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান আশ্বস্ত করেন যে, চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। পলাতক ৫ আসামিকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তাদের দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুতে তৎকালীন সময়ে রাজধানীসহ সারাদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছিল, যার প্রেক্ষিতে এই মামলার চার্জশিট দাখিলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

