আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটকে বিশ্বদরবারে অধিকতর স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক হিসেবে তুলে ধরতে বড় ধরনের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন এই কমিশন এবার বাংলাদেশে আগত বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আতিথেয়তায় এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) কমিশন সচিবালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সংস্থার প্রতিনিধিদের আবাসন ও খাবারের যাবতীয় ব্যয়ভার নির্বাচন কমিশন নিজেই বহন করবে।
নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্ধারিত এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্বের ২৬টি দেশ এবং ৭টি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এসব দেশ ও সংস্থা থেকে আগত মোট ৮৩ জন বিদেশি পর্যবেক্ষকের থাকা ও খাওয়ার সম্পূর্ণ খরচ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মেটানো হবে। মূলত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর আস্থা অর্জনই এই পদক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য।
বিগত নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতির ওপর নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশেই নির্ভর করে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী: ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: এ সময় ৪০টি প্রতিষ্ঠানের ৫১৭ জন বিদেশি এবং স্থানীয় ৮৪টি প্রতিষ্ঠানের ২০ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক উপস্থিত ছিলেন।
২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচন: কমনওয়েলথ, ওআইসি-সহ বিভিন্ন মিশনের ১৬৩ জন বিদেশি কর্মকর্তা এতে অংশ নিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন: প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের কারণে এ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক সংখ্যা ছিল উদ্বেগজনকভাবে কম। মাত্র ৪ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক সে সময় বাংলাদেশে এসেছিলেন।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন: বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সবথেকে বেশি ৫৯৩ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক এই নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
অতীতের রেকর্ড বলছে, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তিগুলো কোনো পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক দল পাঠায়নি, যার ফলে ওই নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘ সময় বিতর্ক ছিল। তবে ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ইইউ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের নির্বাচনের জন্য একটি বড় পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে এবং এ লক্ষ্যে ১০ জানুয়ারি থেকেই তাদের দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষকদের (LTO) প্রথম দলটি বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন আশা করছে, আতিথেয়তার এই নতুন উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক সরব উপস্থিতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যেকোনো সংশয় দূর করতে সহায়ক হবে। পর্যবেক্ষক এবং গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য ইতিমধ্যে ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা ২০২৫’ জারি করা হয়েছে, যেখানে আবেদন করার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ জানুয়ারি ২০২৬। নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

