বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবং পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ সামরিক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে যাচ্ছেন মালদ্বীপের একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা। শনিবার (২৯ নভেম্বর ২০২৫) মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিরক্ষা কূটনীতির অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে পেশাগত উৎকর্ষ সাধন এবং কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শনিবার মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. নাজমুল ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মালদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স (এমএনডিএফ)-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মেজর মোহাম্মদ ইব্রাহিম। মালেতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের চ্যান্সারি ভবনে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। জানা গেছে, মেজর ইব্রাহিম শিগগিরই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য ‘ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ’ (ডিএসসিএসসি) কোর্স-২০২৬-এ অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের মিরপুর সেনানিবাসে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সামরিক কর্মকর্তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য একটি স্বনামধন্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ হাইকমিশন মালদ্বীপের ওই কর্মকর্তাকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা প্রদান করছে।
বৈঠককালে হাইকমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম মেজর ইব্রাহিমকে বাংলাদেশে স্বাগত জানানোর অগ্রিম বার্তা দেন এবং এই কোর্সে মনোনীত হওয়ার জন্য তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যকার সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক গভীর ও অকৃত্রিম বন্ধুত্ব। হাইকমিশনার তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, দুই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ‘প্রতিরক্ষা কূটনীতি’। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ একে অপরের অপরিহার্য অংশীদার। সামরিক কর্মকর্তাদের এই ধরনের প্রশিক্ষণ ও সফর বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে সেই যৌথ অঙ্গীকারই বারবার প্রতিফলিত হয়।
আলোচনার একপর্যায়ে হাইকমিশনার নবীন এই শিক্ষার্থী কর্মকর্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ববহ কিছু পরামর্শ প্রদান করেন। তিনি বলেন, সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে পেশাগত জ্ঞানার্জন এবং নেতৃত্ব প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা নিঃসন্দেহে এই কোর্সের মূল লক্ষ্য। তবে এর বাইরেও একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি মেজর ইব্রাহিমকে উৎসাহিত করেন যেন তিনি বাংলাদেশে অবস্থানকালীন সময়টিকে কাজে লাগিয়ে দেশটির সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হন। বাংলাদেশের আতিথেয়তা, বৈচিত্র্যময় খাবার, পোশাক এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। হাইকমিশনার বিশ্বাস করেন, একজন বিদেশি কর্মকর্তা যখন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের কাছাকাছি যাবেন, তখন তা কেবল সামরিক সম্পর্কই নয়, বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে হৃদ্যতা ও বোঝাপড়াকে আরও গভীর করবে। এটি প্রতিরক্ষা-কেন্দ্রিক জনকূটনীতিকে (Public Diplomacy) শক্তিশালী করার একটি অনন্য সুযোগ।
বাংলাদেশের সামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণকে দুই দেশের টেকসই প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করেন হাইকমিশনার। তিনি উল্লেখ করেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া যা উভয় দেশের বাহিনীর মধ্যে অভিজ্ঞতার বিনিময় ঘটাতে সাহায্য করে। এই প্রসঙ্গে তিনি সদ্য সমাপ্ত ডিএসসিএসসি-২০২৫ কোর্স থেকে সফলভাবে উত্তীর্ণ আরেক এমএনডিএফ কর্মকর্তা মেজর আবদুল্লাহ শানীজের কথা স্মরণ করেন। মেজর শানীজের সফলতার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, মালদ্বীপের কর্মকর্তাদের মেধা, নিষ্ঠা এবং পেশাদারিত্ব সত্যিই প্রশংসনীয়। একজনের সাফল্য পরবর্তী ব্যাচের কর্মকর্তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে এবং মেজর ইব্রাহিমও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে হাইকমিশনার ড. ইসলাম বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আলোকে প্রতিরক্ষা কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সর্বদা প্রতিবেশী এবং বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলায় বিশ্বাসী। বিশেষ করে সামরিক খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত উদার এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রশিক্ষণ প্রদান, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ দীর্ঘদিন ধরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ভৌগোলিক ও পরিবেশগত দিক থেকেও বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য ও অভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হাইকমিশনার উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলা এবং দুর্যোগ পরবর্তী মানবিক সহায়তা প্রদানে দুই দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং একটি নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব অভিন্ন। ভবিষ্যতে এই সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে এবং নতুন নতুন খাতে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
আলোচনার শেষলগ্নে হাইকমিশনার মেজর মোহাম্মদ ইব্রাহিমের আসন্ন বাংলাদেশ সফরের সার্বিক সাফল্য কামনা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মেজর ইব্রাহিম ভবিষ্যতে মালদ্বীপের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। একইসঙ্গে, তিনি মেজর শানীজের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্যও শুভকামনা জানান। হাইকমিশনারের মতে, এই ধরনের পেশাগত ও কৌশলগত আদান-প্রদান আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ়, অর্থবহ এবং সমৃদ্ধ করবে। একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়ার লক্ষে এই অংশীদারিত্ব আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে বৈঠকে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

