দেশের প্রযুক্তি বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় মোবাইল ফোন আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন থেকে মোবাইল আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি (শুল্ক) ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস। একই সাথে বাজারে থাকা বর্তমান অনিবন্ধিত বা অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটগুলোকে কোনো অতিরিক্ত জরিমানা ছাড়াই ‘স্টক-লট’ হিসেবে বৈধ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ জসীম উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে এই সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে বৈধ পথে স্মার্টফোন আমদানি উৎসাহিত হবে এবং বাজারে মোবাইল ফোনের আকাশচুম্বী দাম অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কেবল আমদানিকৃত সেট নয়, বরং দেশীয় মোবাইল উৎপাদন শিল্পকেও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে যারা মোবাইল ফোন উৎপাদন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় উদ্যোক্তারা ৫০ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পাবেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আমদানির বিপরীতে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাস্তব বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় এই শুল্ক কমানোর সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও এই শুল্ক হ্রাসের ফলে চলতি অর্থবছরে সরকারের প্রায় ৩৫ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও অবৈধ বাজার ও চোরাচালান রোধে এটি দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের জন্য বড় খবর হলো, বিটিআরসি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যে সমস্ত ফোন আমদানি করা হয়েছিল কিন্তু কারিগরি কারণে অবৈধ তালিকায় ছিল, সেগুলোকে এখন কোনো অতিরিক্ত শুল্ক ছাড়াই বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের হাতে থাকা এই ‘স্টক-লট’ ফোনগুলোকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) সিস্টেমে নিবন্ধনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হবে। এজন্য ব্যবসায়ীদের কেবল তাদের কাছে থাকা বৈধ হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (IMEI) নম্বরের তালিকা বিটিআরসির কাছে জমা দিতে হবে।
বৈঠকে প্রবাসীদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে প্রবাসীরা দেশে আসার পর তাদের সাথে থাকা ব্যক্তিগত ফোনগুলো তিন মাস পর্যন্ত কোনো বাধা ছাড়াই ব্যবহার করতে পারবেন। যারা তিন মাসের কম সময় দেশে অবস্থান করবেন, তাদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধনের প্রয়োজন হবে না। তবে কেউ যদি তিন মাসের বেশি সময় দেশে থাকতে চান, তবে পরবর্তী সময়ে তাকে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও সুখবর দিয়েছে মন্ত্রণালয়। আগামী তিন মাস কোনো সাধারণ গ্রাহকের মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন বা ব্লক করা হবে না। এই সময়ের মধ্যে ব্যবসায়ীরা তাদের মজুদ করা সেটগুলো নিয়মিত করার সুযোগ পাবেন এবং গ্রাহকরাও তাদের হ্যান্ডসেটের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করার সময় পাবেন।
শুল্ক কমানো ও বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে সরকার। বিটিআরসি ভবনে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মুহম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, এই ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতরা কোনোভাবেই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে।
একই সাথে তিনি সতর্ক করে দেন যে, বৈধ পথে মোবাইল আমদানির সুযোগ সহজ করার পর এখন থেকে অবৈধ পথে সেট আনা বা বিক্রি করার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। দেশের সকল স্থলবন্দর, বিমানবন্দর এবং কাস্টমস হাউজগুলোতে নজরদারি ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজনে দেশের বড় বড় পাইকারি বাজারেও অভিযান চালিয়ে অবৈধ সেট জব্দ করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই সমন্বিত সিদ্ধান্তের ফলে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে এবং গ্রাহকরা সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ডিভাইস কিনতে পারবেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

