দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ও আপসহীন রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন বাংলাদেশের তিনবারের সফল সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকাল থেকেই প্রিয় নেত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং তার কবর জিয়ারত করতে রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে আসা হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল নামে। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত সমাধি প্রাঙ্গণে আজ কেবল রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের এক গভীর আবেগঘন ও শোকাতুর পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দেশের এই প্রভাবশালী নারী নেত্রী। বুধবার বিকেলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শেষে তাকে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। দাফনের পর নিরাপত্তার খাতিরে সাধারণের প্রবেশ সাময়িকভাবে সীমিত থাকলেও, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার পর জিয়া উদ্যান জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা পর লেক রোডসহ প্রবেশপথগুলো খুলে দেওয়ার সাথে সাথেই সেখানে অপেক্ষমাণ হাজার হাজার মানুষ শৃঙ্খলার সাথে সমাধি অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন।
জিয়া উদ্যানের প্রবেশমুখে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে মানুষ যখন কবরের পাশে পৌঁছান, তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অসংখ্য মানুষকে দেখা যায় কবরের সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতে। নেতাকর্মীদের কেউ কেউ কবরের পাশে বসে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করছেন, আবার কেউ দুহাত তুলে প্রিয় নেত্রীর আত্মার শান্তি কামনায় দীর্ঘ মোনাজাতে মগ্ন রয়েছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যারা দূর-দূরান্ত থেকে কেবল নেত্রীর শেষ শয্যাটি একবার দেখার জন্য ছুটে এসেছেন।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভিড় আরও বাড়তে থাকে। বিএনপির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী ফুল হাতে সারিবদ্ধভাবে কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর দুপুরের দিকে জিয়া উদ্যানে এসে বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন। এছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও সেখানে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা বলেন, বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের আশা-ভরসার আশ্রয়স্থল। তার বিদায়ে জাতি একজন সাহসী অভিভাবককে হারিয়েছে।
শ্রদ্ধা নিবেদনে আসা পঞ্চগড় জেলা বিএনপির প্রতিনিধি দলও ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পঞ্চগড় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাহিরুল ইসলাম কাচু বলেন, “আমরা দেশের একেবারে সীমান্তবর্তী জেলা থেকে প্রিয় নেত্রীর জানাজায় অংশ নিতে এসেছিলাম। দাফন শেষ হলেও আমাদের মন মানছে না, তাই আজ কবর জিয়ারত করে দোয়া পড়তে এসেছি। বেগম খালেদা জিয়ার যে আপসহীন আদর্শ, তা আমাদের হৃদয়ে অম্লান থাকবে এবং আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই আদর্শ বাস্তবায়নে রাজপথে অবিচল থাকব।”
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকেও অসংখ্য সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কবর জিয়ারত করতে আসেন। অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছেন প্রিয় নেত্রীর শেষ ঠিকানা দেখাতে। কবরের চারপাশ ঘিরে রাখা হয়েছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় দিয়ে, যেখানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা আগতদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহযোগিতা করছিলেন। দুপুর ২টা পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানানোর এই জনস্রোত শেরেবাংলা নগর এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে বিস্তৃত হয়ে পড়ে, যা প্রিয় নেত্রীর প্রতি সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার এক অনন্য নজির স্থাপন করে।
বেগম খালেদা জিয়ার এই বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছে। তার সমাধি এখন লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে ত্যাগের এক পবিত্র স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপস্থিত শোকাতুর জনতা ও নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেগম খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া সংগ্রাম ও দেশপ্রেমের চেতনা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। যত দিন গড়াবে, জিয়ার উদ্যানের এই সমাধি প্রাঙ্গণ মানুষের শ্রদ্ধা ও দোয়ায় আরও মুখরিত হয়ে উঠবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

