বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গভীর শোক ও সমবেদনা জানানো হয়েছে। শোক প্রকাশের এই ধারায় আজ বৃহস্পতিবার সকালে ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে সশরীরে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি শোক বইতে স্বাক্ষর করেন এবং বাংলাদেশের এই প্রভাবশালী নেত্রীর প্রয়াণে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক শোকের ছায়া নেমে আসে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) গভীর শোক প্রকাশ করেন। সেই দিনই তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে একটি আনুষ্ঠানিক পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে মোদী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘মহামান্য’ সম্বোধন করে তার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করেন এবং এই কঠিন সময়ে তারেক রহমান ও তার পরিবারের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানান।
ভারতের পক্ষ থেকে এই শোকের বহিঃপ্রকাশ কেবল বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বিশেষ সফরে ঢাকায় আসেন। তিনি সরাসরি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত শোকবার্তাটি তার হাতে হস্তান্তর করেন। এস জয়শঙ্করের এই সফর এবং তারেক রহমানের সাথে তার বৈঠককে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। জয়শঙ্কর তার বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতায় তার অবদানের কথা স্মরণ করেন।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে রাজনাথ সিংয়ের সফর ভারতের এই উচ্চপর্যায়ের শোক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। রাজনাথ সিং শোক বইতে মন্তব্য লিখতে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একজন প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিদায়ে ভারতের সংহতি প্রকাশ করেন। এই সফরকালে তার সাথে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। হাইকমিশনে কিছুক্ষণ অবস্থান করে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সাথে সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় শোকাতুর দেশবাসীর প্রতি সমবেদনা জানান।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের এই ব্যাপক ও উচ্চপর্যায়ের তৎপরতা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব যেভাবে সরাসরি বিএনপির নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছে, তাকে অনেকেই দিল্লির একটি কৌশলগত এবং ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘প্রিয় তারেক রহমান সাহেব’ সম্বোধন করে পাঠানো নরেন্দ্র মোদীর পত্রটি বিশেষ আলোচনার সৃষ্টি করেছে। একে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের সাথে ভারতের একটি নতুন মাত্রার যোগাযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে যেমন একজন প্রবীণ নেত্রীর বিদায় দেশবাসীকে শোকাতুর করেছে, অন্যদিকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার এই কূটনৈতিক সৌজন্য ও উচ্চপর্যায়ের সংহতি ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। দিল্লির এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের কাছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সকল গণতান্ত্রিক শক্তির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনাথ সিংয়ের এই সফর এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের আন্তরিক পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মাঝেও ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সৃষ্ট এই শূন্যতার মুহূর্তে ভারতের এই সহমর্মিতাকে গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করেছে তার পরিবার ও রাজনৈতিক দল। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবন শেষে বেগম খালেদা জিয়ার এই বিদায় কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং আঞ্চলিক কূটনীতিতেও এক বিশেষ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছে।

