অশ্রুসিক্ত নয়ন আর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হলো বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে (চন্দ্রিমা উদ্যান সংলগ্ন) সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের পর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটল বাংলাদেশের রাজনীতির এক বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘ সংগ্রামের অধ্যায়।
বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত বিশাল জানাজা শেষে মরদেহবাহী কফিনটি বিশেষ প্রটোকলে জিয়া উদ্যানে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তিন বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) একটি চৌকস দল তাঁকে সশস্ত্র সালাম ও গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় তিন বাহিনীর প্রধানগণ উপস্থিত থেকে মরহুমার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। দাফনের আগে প্রিয় নেত্রীকে একনজর দেখতে এবং শেষ বিদায় দিতে কবরের চারধারে ভিড় জমায় হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ। দাফন প্রক্রিয়া চলাকালে বড় ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ হাতে মাকে কবরে শায়িত করেন।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত এই জানাজাকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জানাজা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। জানাজায় অংশ নেন:
মো. সাহাবুদ্দিন: রাষ্ট্রপতি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। ড. মুহাম্মদ ইউনূস: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। উপদেষ্টামণ্ডলী: সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাগণ। বিদেশের প্রতিনিধি: ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক এবং ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিয়নপো ডি. এন. ধুংগেল। কূটনৈতিক মহল: যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়াসহ ৩২টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারগণ জানাজার প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন।
জানাজায় কেবল বিএনপির নেতাকর্মীরাই নন, বরং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। সকাল থেকেই রাজধানীর ফার্মগেট, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার এবং আগারগাঁও এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। সংসদ ভবনের উত্তর প্লাজায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছিল এবং শুধুমাত্র আমন্ত্রিত ও অনুমোদিত ব্যক্তিদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সরকার ঘোষিত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের আজ ছিল প্রথম দিন। দেশজুড়ে বিভিন্ন মসজিদে গায়েবানা জানাজা ও বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাঁদের প্রিয় নেত্রীর মাগফিরাত কামনা করেছেন। স্বামী ও স্ত্রীর এই কবরের পুনর্মিলন যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিয়োগান্তক কিন্তু সম্মানজনক সমাপ্তির ছবি এঁকে দিল।

