চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানা এলাকায় চাঞ্চল্যকর ইমন দাশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তসহ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৭)। গত বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে মামলার মূল হোতা নয়ন মহাজন (২৯) এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নেজাম উদ্দিনকে (৩৫) আটক করা হয়। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার এই সাফল্যে এলাকায় স্বস্তি ফিরলেও হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, নিহত ইমন দাশ পটিয়া উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হলেও দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন। গত ৩০ নভেম্বর ভোরে প্রাত্যহিক পূজার জন্য ফুল সংগ্রহ করতে তিনি চান্দগাঁও থানাধীন মৌলভীবাজার সেন বাড়ি এলাকায় বের হন। আগে থেকেই ওত পেতে থাকা একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত পূর্বশত্রুতার জের ধরে তার পথরোধ করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে যে, প্রধান আসামি নয়ন মহাজনের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী দেশীয় ধারালো অস্ত্র, লোহার রড ও রামদা নিয়ে ইমনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
হামলাকারীরা অত্যন্ত নির্মমভাবে ইমনের শরীরের বিভিন্ন অংশে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। জনশূন্য ভোরে ইমনের আর্তচিৎকারে স্থানীয়রা এবং তার পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘ দুই সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর গত ১৪ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ইমন দাশ।
এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পিতা সাগর দাশ বাদী হয়ে চান্দগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ আরও দুই থেকে তিনজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পরপরই আসামিরা আত্মগোপনে চলে গেলে পুলিশ ও র্যাব ছায়াতদন্ত শুরু করে। পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করতে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা গ্রহণ করে।
র্যাব-৭-এর নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, মামলার প্রধান আসামি নয়ন মহাজন গ্রেপ্তার এড়াতে হাটহাজারী এলাকায় অবস্থান করছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার ভোরে হাটহাজারী বিশ্ববিদ্যালয় রোড এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালায় র্যাবের একটি চৌকস দল। সেখান থেকে নয়ন মহাজনকে আটক করার পর তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেলে হাটহাজারীর মদনহাট এলাকায় দ্বিতীয় অভিযান চালিয়ে সহযোগী আসামি মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে চট্টগ্রাম র্যাবের সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এ আর এম মোজাফ্ফর হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, আসামিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। পূর্বশত্রুতার আক্রোশ থেকেই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে তাদের চান্দগাঁও থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে বা জনসমক্ষে এমন বর্বরোচিত হামলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। তবে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করায় প্রশাসনের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার। তারা এখন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানাচ্ছেন।
বর্তমানে চান্দগাঁও এবং মৌলভীবাজার এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে যাতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়। এই হত্যাকাণ্ডটি চট্টগ্রামের অপরাধচিত্রের এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এখন সবার দৃষ্টি আদালতের দিকে, যেখানে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আসামিদের রিমান্ড চেয়ে আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।

