দুর্নীতি দমনে রাষ্ট্রীয় অন্যতম প্রধান সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাঠামো ও কার্যপরিধিতে আমূল পরিবর্তন এনে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে। বুধবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অনুমোদনক্রমে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যার মাধ্যমে সংস্থাটির সক্ষমতা বৃদ্ধি, কমিশনের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচার সংক্রান্ত অপরাধের তদন্তে দুদকের এখতিয়ার বহুগুণে সম্প্রসারিত হয়েছে।
২০০৪ সালের মূল আইন সংশোধন করে জারি করা এই অধ্যাদেশে আধুনিক অপরাধের ধরণ বিবেচনা করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি জেন্ডার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো কমিশনের কলেবর বৃদ্ধি। আগে যেখানে তিন সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হতো, এখন সেখানে সর্বোচ্চ পাঁচজন কমিশনার নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। সংশোধিত আইনের ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এই পাঁচজন কমিশনারের মধ্যে অন্তত একজন নারী সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ ছাড়া সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল অপরাধ এবং জটিল আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করতে কমপক্ষে একজন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। এই পাঁচজনের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করবেন। কাঠামোগত এই পরিবর্তন দুদককে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও বিতর্কমুক্ত রাখতে নিয়োগের ‘বাছাই কমিটি’র গঠনেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইতিপূর্বে প্রচলিত ‘সার্চ কমিটি’র নাম পরিবর্তন করে এখন থেকে ‘যাচাই-বাছাই কমিটি’ হিসেবে অভিহিত করা হবে। আইনের ৭ নম্বর ধারার এই সংশোধনীতে বলা হয়েছে, নতুন এই কমিটির সভাপতিত্ব করবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি।
কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে থাকবেন প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান। রাজনৈতিক ঐকমত্য নিশ্চিত করতে এই কমিটিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত দুজন সংসদ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাদের মধ্যে একজন সরকারি দলের এবং অন্যজন বিরোধী দলের হবেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংসদ ভেঙে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্য ছাড়াই কমিটি কাজ চালিয়ে যেতে পারবে বলে বিশেষ শর্ত রাখা হয়েছে।
দুদকের কার্যকারিতা বাড়াতে এনফোর্সমেন্ট ও গোয়েন্দা কার্যক্রমকে প্রথমবারের মতো আইনের মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইতিপূর্বে এই কার্যক্রমগুলো কেবল বিধিমালা দ্বারা পরিচালিত হতো, যা অনেক ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা তৈরি করত। এখন থেকে আইনের ৩ নম্বর উপধারা অনুযায়ী দুদক স্বাধীনভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং তাৎক্ষণিক অভিযান বা এনফোর্সমেন্ট পরিচালনা করতে পারবে। এটি মূলত সংস্থাটিকে আরও আক্রমণাত্মক এবং মাঠ পর্যায়ে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে এবারের সংশোধনীতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচার সংক্রান্ত অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষেত্রে। ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে থাকা বিশাল একটি অংশ এখন দুদকের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে দুদক কেবল সরকারি কর্মচারী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঘুষ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত অর্থপাচার নিয়ে কাজ করত।
কিন্তু নতুন অধ্যাদেশে দলিল দস্তাবেজ জালকরণ, প্রতারণা, জালিয়াতি, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার, এবং চোরাচালান ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধগুলোকেও দুদকের তদন্ত ক্ষমতার আওতায় আনা হয়েছে। বিশেষ করে পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা রক্ষায় মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করে বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে যারা বাজার কারসাজি করেন, তাদের বিরুদ্ধেও এখন থেকে দুদক সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারবে। কর ফাঁকি বা কর সংক্রান্ত অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থপাচার অনুসন্ধানেও এখন থেকে দুদক বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করবে।
এই আমূল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে। ওই কমিশন চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করে, যেখানে দুদককে একটি প্রকৃত স্বাধীন ও সাংবিধানিক সংস্থায় রূপান্তরসহ মোট ৪৭টি সুপারিশ করা হয়েছিল।
সংস্কার কমিশনের মূল লক্ষ্য ছিল দুদককে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত করে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে গড়ে তোলা। যদিও অধ্যাদেশটি জারির পর কিছু ক্ষেত্রে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গত ২৮ নভেম্বর তাদের এক বিবৃতিতে এই অধ্যাদেশ নিয়ে কিছুটা হতাশা ব্যক্ত করেছিল, কারণ তাদের মতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ এই চূড়ান্ত সংস্করণে স্থান পায়নি। তা সত্ত্বেও, নতুন আইনটি যে দুদকের স্থবিরতা কাটাতে এবং অপরাধের ক্রমবর্ধমান আধুনিকায়ন মোকাবেলা করতে সহায়ক হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন এই আইনি কাঠামো দুদকের ওপর অর্পিত নাগরিক প্রত্যাশার চাপ অনেক বাড়িয়ে দেবে। একদিকে পাঁচ সদস্যের কমিশন নিয়োগের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৈচিত্র্য আসবে, অন্যদিকে অর্থপাচার সংক্রান্ত অপরাধে বিস্তৃত ক্ষমতা প্রদান করায় সংস্থাটির ওপর কাজের চাপও বহুগুণ বাড়বে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা বাছাই কমিটির মাধ্যমে যোগ্য ও নিরপেক্ষ কমিশনার নিয়োগ করা গেলে দুদক বাংলাদেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে। বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি বিরোধী প্রচেষ্টার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা সূচকেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

