ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণ আজ রূপ নিয়েছিল এক স্তব্ধ ও শোকাতুর জনসমুদ্রে। জানাজার নামাজ শেষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি চত্বরে শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে যখন দাফন করা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখ ছিল অশ্রুসজল।
দাফন পরবর্তী মোনাজাতে এক অবর্ণনীয় শোকের আবহ তৈরি হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রিয় নেতা ও সহযোদ্ধার বিদায়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। চোখের জল, অস্ফুট দোয়া আর এক ভারী নীরবতার মধ্য দিয়ে দেশপ্রেমিক এই তরুণ তুর্কিকে শেষ বিদায় জানানো হয়।
শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশের নির্ধারিত স্থানে ওসমান হাদির দাফন সম্পন্ন হয়। দাফন প্রক্রিয়া শেষে শুরু হয় দীর্ঘ মোনাজাত। কেবল কবরস্থানের ভেতর থাকা স্বজনরাই নন, গেটের বাইরে অবস্থানরত হাজারো স্বেচ্ছাসেবী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং এমনকি দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও হাত তুলে মোনাজাতে অংশ নিতে এবং চোখের জল মুছতে দেখা যায়। দাফনের চূড়ান্ত মুহূর্তে পুরো এলাকায় এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে, যা কেবল মানুষের কান্নার শব্দে ক্ষণে ক্ষণে ভেঙে যাচ্ছিল।
মোনাজাত শুরু হতেই উপস্থিত জনতা আর নিজেদের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। কেউ দুহাত তুলে অঝোরে কাঁদছিলেন, কেউ আবার নতমস্তকে পবিত্র কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন। দাফনে অংশ নেওয়া মুসল্লিরা সমস্বরে হাদির আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
সমবেত জনতা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, শরীফ ওসমান হাদির অকাল মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং এটি পুরো জাতির জন্য এক বিশাল শূন্যতা। তার আদর্শ ও দেশপ্রেমের যে মশাল তিনি জ্বালিয়ে গেছেন, তা চিরকাল তরুণ সমাজকে পথ দেখাবে।
জানাজায় দায়িত্বরত আশিকুর রহমান নামক এক তরুণ স্বেচ্ছাসেবী তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “দায়িত্ব পালনের কারণে হাদি ভাইকে শেষবার সামনাসামনি দেখতে পারিনি, তাই গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেই গভীর আক্ষেপ নিয়ে তাকে বিদায় জানালাম। তিনি আমাদের কাছে কেবল একজন রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি অটল বিশ্বাসের নাম, একটি সংগ্রামের প্রেরণা।” আশিকুরের মতো এমন হাজারো তরুণের চোখে আজ ছিল প্রিয় নেতৃত্বকে হারানোর বিষাদ।
কবরস্থানে হাদির পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের আহাজারিতে পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। প্রিয়জনকে নিজ হাতে কবরে শায়িত করার শেষ মুহূর্তে হাদির সহযোদ্ধা ও সহকর্মীরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাদের কান্নায় বাতাসের প্রতিটি কণা যেন শোকাতুর হয়ে উঠেছিল। জাতীয় কবির সমাধির পাশে শায়িত হওয়ার মাধ্যমে হাদির বিদ্রোহী চেতনা যেন এক চিরন্তন পূর্ণতা পেল।
শেষ মোনাজাতে উপস্থিত সবাই মহান আল্লাহর দরবারে আকুল প্রার্থনা জানান, যেন তিনি শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। একইসাথে তার শোকসন্তপ্ত পরিবার, বিশেষ করে তার নাবালক সন্তান ও স্ত্রীকে এই কঠিন শোক সহ্য করার ধৈর্য ও শক্তি দান করেন। হাদির দাফন সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলেও, তার রেখে যাওয়া ‘ইনকিলাব’ চেতনা আজ থেকে কয়েক লাখ মানুষের হৃদয়ে নতুন করে প্রজ্জ্বলিত হলো।

