জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রাণপুরুষ এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির নির্মম হত্যাকাণ্ডে পুরো দেশ যখন ক্ষোভে ফুঁসছে, তখন রাজধানীর শাহবাগে দেখা গেল এক মানবিক ও আবেগঘন দৃশ্য। গতরাত থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারায় আজ শুক্রবার সকালেও যখন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা রাজপথ আগলে রেখেছেন, তখন তাদের প্রতি মমত্ববোধ নিয়ে ছুটে এসেছেন রাশিদা রহমান নামে এক ষাটোর্ধ্ব গৃহিণী। নিজের জমানো টাকা দিয়ে কেনা কলা, পাউরুটি, খেজুর ও শুকনো খাবার নিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন আন্দোলনকারীদের পাশে, যা এই উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেও এক অনন্য সংহতির নজির স্থাপন করেছে।
রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী থেকে আসা রাশিদা রহমান জানান, ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে তিনি প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলেন, “আমার সন্তানতুল্য হাদি মারা গেছে, এই শোক সহ্য করার মতো নয়। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি, শুধু ওর হাস্যোজ্জ্বল মুখটা চোখের সামনে ভাসছে। সকালে উঠেই নিজের সামান্য জমানো টাকা দিয়ে এই খাবারগুলো কিনেছি। রাজপথে আমার যে সন্তানেরা হাদি হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তাদের মুখে সামান্য খাবার তুলে দিতেই আমার এখানে আসা।” একজন সাধারণ গৃহিণীর এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, হাদির মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং তা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।
এদিকে শাহবাগ এলাকা এখন প্রতিবাদী মানুষের এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। শনির আখড়া থেকে আসা মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আশফাকুর রহমান অত্যন্ত আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক ও সাহসী মানুষকে হারিয়েছি। হাদি ভাইয়ের মতো মেধাবী ও লড়াকু নেতৃত্বের প্রস্থান আমাদের জাতীয় জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি। তার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরব না।” রামপুরা থেকে বিক্ষোভে যোগ দেওয়া ইমরুল কায়েসও একই প্রতিধ্বনি করেন। তিনি জানান, এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে খুনিদের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিক্ষোভকারীদের ‘ফ্যাসিবাদের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ এবং ‘হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’—এমন সব তেজোদীপ্ত স্লোগানে এখন প্রকম্পিত পুরো এলাকা।
গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে সন্ত্রাসীদের কাপুরুষোচিত হামলায় গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি। ঢাকা মেডিকেল ও এভারকেয়ার হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলেও গতরাতে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার এই মৃত্যুর খবরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গতকাল রাতে কিছু জায়গায় অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে, যার ফলে নির্দিষ্ট কিছু সংবাদপত্রের কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আজ তাদের প্রকাশনাও বন্ধ রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী কাল শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সারা দেশে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। তবে রাজপথের আন্দোলনকারীদের দাবি কেবল শোক পালনেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা চান এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আজ সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে হাদির মরদেহ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত এক বিশাল শোক মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তার সহযোদ্ধারা।
শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাশিদা রহমানের মতো সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসা ও আশীর্বাদ হাদির সংগ্রামকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। একদিকে শোকের মাতম, অন্যদিকে বিচারের দাবিতে অনড় অবস্থান—সব মিলিয়ে আজ ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অগ্নিঝরা দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং মমত্ববোধ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ন্যায়ের লড়াইয়ে তারা একচুলও ছাড় দিতে প্রস্তুত নন।

