জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অকুতোভয় যোদ্ধা এবং ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানীর শাহবাগ। শুক্রবার সকাল থেকেই ছাত্র-জনতার ঢল নামতে শুরু করে ঐতিহাসিক এই মোড়ে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিক্ষোভের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় এবং সমাবেশ থেকে আন্দোলনকারীরা ভারতীয় পণ্য বয়কটের জোরালো ডাক দেন। তারা এই হত্যাকাণ্ডকে নিছক কোনো অপরাধ হিসেবে নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং বিদেশি আধিপত্যবাদের নীলনকশা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আজ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শাহবাগের ‘৩৬ জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ প্রাঙ্গণে সমবেত হতে থাকেন শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। ব্যানার, ফেস্টুন আর জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষুব্ধ জনতা ‘ভারতীয় পণ্য, বয়কট-বয়কট’, ‘দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা-ঢাকা’ এবং ‘হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’—এমন সব তেজোদীপ্ত স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচারণাকালে হাদির ওপর যে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে, তার পেছনে প্রতিবেশী দেশের মদদপুষ্ট ফ্যাসিবাদী শক্তির হাত রয়েছে। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত হাদির প্রকৃত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার এবং নেপথ্যের ষড়যন্ত্র উন্মোচন করা হচ্ছে, ততক্ষণ তারা রাজপথ ছাড়বেন না।
শাহবাগের এই গণসমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে যোগ দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), ইসলামী ছাত্রশিবির এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম জুমার নামাজের পর শাহবাগে এক বিশাল ‘আধিপত্যবাদবিরোধী সমাবেশ’-এর ডাক দেন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই বিপ্লবের এক জীবন্ত প্রতীক। তাকে হত্যার মাধ্যমে ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে স্তব্ধ করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা সফল হতে দেওয়া হবে না। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এবং খুনিদের অবিলম্বে বিচারের আওতায় না আনলে দেশজুড়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র শাহবাগ নয়, বরং রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, নীলক্ষেত এবং উত্তরাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল রাতে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে হাদির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজধানী এক থমথমে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গতকাল মধ্যরাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। আজ শাহবাগে জড়ো হওয়া সাধারণ মানুষের চোখেমুখে ছিল গভীর শোক আর হৃদয়ে ছিল প্রতিশোধের আগুন। তারা বলছেন, হাদি ছিলেন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর, আর তাকে থামিয়ে দিতেই বেছে নেওয়া হয়েছে বুলেটের পথ।
বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে আন্দোলনকারীরা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তারা বলেন, বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট দেশের তাবেদার নয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। প্রতিবাদী ছাত্ররা বলেন, ‘আমরা সবাই হাদি হবো, যুগে যুগে লড়ে যাবো’। তাদের দাবি, দেশের প্রতিটি কোণ থেকে ফ্যাসিবাদী দোসরদের চিহ্নিত করে নির্মূল করতে হবে। এছাড়া, সীমান্তে প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসী মনোভাব এবং দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদের প্রসারের বিরুদ্ধেও তারা তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন।
এদিকে, শরীফ ওসমান হাদির মরদেহ আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তার কফিন গ্রহণের জন্য বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত এক বিশাল শোক মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চ ও সহযোদ্ধা সংগঠনগুলো। মরদেহ দেশে আসার পর জানাজার সময়সূচি ঘোষণা করা হবে। সরকার ইতোমধ্যে হাদির স্মরণে শনিবার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় শোকের চেয়েও বড় প্রয়োজন হলো ন্যায়বিচার এবং খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
শাহবাগের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় পুরো এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের মুখে তারা অনেকটা নির্বাক দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। শাহবাগ চত্বর এখন এক বিপ্লবী ময়দানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি স্লোগান আর প্রতিটি দাবি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ বহন করছে। হাদির এই বিয়োগান্তক মৃত্যু যেন সারা দেশের মানুষের মধ্যে এক নতুন চেতনার জন্ম দিয়েছে, যা আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

