সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির প্রথম জানাজা দেশটিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। সিঙ্গাপুর সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি বা ‘ক্লিয়ারেন্স’ না পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার দুপুরে সিঙ্গাপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন এক আনুষ্ঠানিক বার্তার মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গতকাল রাতে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ওসমান হাদি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর সেখানে তার প্রথম জানাজা আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু স্থানীয় আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রোটোকল অনুযায়ী যথাযথ অনুমতি না মেলায় জানাজা অনুষ্ঠান করা সম্ভব হচ্ছে না। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য হাইকমিশন গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে। ফলে কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই আজ সন্ধ্যায় তার মরদেহ সরাসরি বাংলাদেশে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাটি গত কয়েকদিন ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণা শেষে ফেরার পথে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় গত ১৫ ডিসেম্বর তাকে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ লড়াই শেষে গতকাল তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
ওসমান হাদির এই অকাল প্রয়াণে তার সমর্থক এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় আজ বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে (বিজি ৫৮৫) তার মরদেহ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। সব ঠিক থাকলে ফ্লাইটটি বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে। সিঙ্গাপুরে জানাজা না হওয়ায় এখন তার মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছানোর পরই প্রথম জানাজা এবং পরবর্তী শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে, হাদি হত্যার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকা আজ উত্তাল হয়ে উঠেছে। শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব এবং বায়তুল মোকাররমসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন। সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে হাদির খুনিদের প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি জানানো হচ্ছে, যা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
হাদির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও বিষাদের ছায়া নেমে এসেছিল। অনেকেই সেখানে তার জানাজায় শরীক হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে প্রশাসনিক জটিলতায় জানাজা না হওয়ায় তারা হতাশ হয়েছেন। হাইকমিশন এবং নিহতের পরিবার এখন দ্রুততম সময়ে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের জন্য ইনকিলাব মঞ্চের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও হাদির আত্মীয়-স্বজনদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদি কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই ছিলেন না, বরং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এক পরিচিত কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। তার মৃত্যুতে একটি উদীয়মান নেতৃত্বের অবসান ঘটল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আজ সন্ধ্যায় মরদেহ ঢাকায় পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর এলাকায় বড় ধরনের জমায়েত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

