পাবনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার মো. শামসুল হক টুকু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৩৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে শামসুল হক টুকুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়েরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর দুই পুত্র ও পুত্রবধূর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় তাঁদের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের জনসংযোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাবেক এই ডেপুটি স্পিকারের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৫৯ লাখ ২৪ হাজার ১৮১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলাটি অনুমোদিত হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তাঁর বৈধ আয়ের উৎস ছিল ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৭৯ হাজার ৮৩৫ টাকা, অথচ তাঁর দখলে থাকা সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৯৬ লাখ ৪ হাজার ১৬ টাকা। আয়ের সাথে এই বিশাল অসংগতির কারণে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে এই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কেবল শামসুল হক টুকু নন, তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। দুদকের অনুসন্ধানে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বেড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এস এম আসিফ শামসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থাৎ ২৬ কোটি ৬৬ লাখ ৬৮ হাজার ৫৪৩ টাকার অবৈধ সম্পদের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আসিফ শামসের বৈধ আয় ছিল মাত্র ৩ লাখ ৯৯ টাকা, কিন্তু তাঁর নামে অর্জিত সম্পদের পাহাড় দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৬৯ লাখ ৬৮ হাজার ৬৪২ টাকায়।
এছাড়া শামসুল হক টুকুর অন্য এক ছেলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এস এম নাসিফ শামসের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৬৪ লাখ ৫৮ হাজার ৩৯৫ টাকার এবং নাসিফের স্ত্রী মিসেস মুমতাহিন মোস্তফার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬৬ হাজার ৭৫০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই তিনজনের বিরুদ্ধেই দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারা মোতাবেক সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন দুর্নীতির মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে দুদকের অভিযোগ থেকে জানা যায়। উল্লেখ্য যে, ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই শামসুল হক টুকু আত্মগোপনে চলে যান এবং পরবর্তীতে রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার হন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মামলায় কারান্তরীণ রয়েছেন। এর আগে তাঁর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লক করারও নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।
দুদকের এই সিদ্ধান্ত পাবনা ও বেড়া এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে শামসুল হক টুকু ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম এবং নদী দখলের মতো গুরুতর অভিযোগ ছিল সাধারণ মানুষের। দুদকের এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা সঞ্চারিত হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে খুব শীঘ্রই চার্জশিট দাখিল এবং আইনি লড়াই শুরু হবে।

