১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ। বাঙালির ওপর নেমে আসা ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীর কাছ থেকে আড়াল করতে তৎকালীন পাকিস্তানি জান্তা সরকার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয়েছিল। সেই কালো রাতে ঢাকায় অবস্থানরত প্রায় অর্ধশতাধিক বিদেশি সাংবাদিককে তৎকালীন মেজর সিদ্দিক সালিকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ট্রাক বোঝাই করে বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। কিন্তু সত্যকে কি আর চেপে রাখা যায়? সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অদম্য লড়াই আর পাক হানাদারদের বর্বরতা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এক অবিনাশী মহাকাব্য হিসেবে।
১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১—বাঙালি জাতির সেই অবিস্মরণীয় বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো কীভাবে সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে তুলে ধরেছিল, তা আজকের প্রজন্মের কাছে এক পরম গর্বের অধ্যায়। যুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে অনেক সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন। তারা কেবল যুদ্ধের খবরই সংগ্রহ করেননি, বরং সচক্ষে দেখেছেন রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজীর সেই লজ্জিত আত্মসমর্পণ।
লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। তরুণ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং যখন প্রথম গণহত্যার খবর বিশ্বকে জানান, তখন থেকেই এই পত্রিকাটির ওপর মানুষের আস্থা তৈরি হয়। ১৭ই ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ পত্রিকাটি ‘টাইগার নেয়ারলি ইন টিয়ার্স’ (TIGER NEARLY IN TEARS) শিরোনামে এক বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বর্ণিত হয়, যে জেনারেল নিয়াজী একদিন আগে পর্যন্ত দম্ভভরে বলেছিলেন, “ঢাকার প্রতিটি রাস্তায় যুদ্ধ হবে এবং ভারতীয়দের আমার লাশের ওপর দিয়ে ঢুকতে হবে,” সেই নিয়াজীকেই আত্মসমর্পণের দলিলে সই করার পর প্রায় কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। তিনি তার ডান কাঁধ থেকে পদমর্যাদার ব্যাজ খুলে ফেলেন এবং তার রিভলভারটি ভারতীয় জেনারেল জে.এস. অরোরার হাতে তুলে দেন। এটি ছিল কেবল একটি সামরিক আত্মসমর্পণ নয়, বরং একটি শোষক শক্তির নৈতিক ও রাজনৈতিক পরাজয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও সে দেশের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ ছিল সত্যের পক্ষে আপসহীন। বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক জেমস পি. সিয়েরা ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকাতেই অবস্থান করছিলেন। ১৭ই ডিসেম্বর তার লেখা প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘জয় অ্যান্ড মেরিগোল্ডস’ (Joy and Marigolds)।
সিয়েরা বর্ণনা করেন, পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের পরপরই পুরো ঢাকা শহর যেন এক আনন্দ উৎসবে পরিণত হয়। ভারতীয় ও মুক্তি সেনাদের ট্রাকের অগ্রভাগে শোভা পাচ্ছিল বিজয়ের গাঁদা ফুল। বাঙালিরা ভারতীয় পাঞ্জাবি সৈন্যদের জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছিল এবং তাদের ওপর ফুল ছুড়ে মারছিল। সিয়েরার লেখায় উঠে আসে এক অদ্ভুত দৃশ্য—একই ব্রিটিশ একাডেমিতে পড়া ভারতীয় ও পাকিস্তানি অফিসাররা যখন একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছিলেন, তখন সেখানে যুদ্ধের উত্তেজনার চেয়েও বেশি ছিল পুরোনো সহকর্মীদের দেখা পাওয়ার এক বিষণ্ণ সৌজন্য।
তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সাময়িকী ‘টাইম ম্যাগাজিন’ ২০শে ডিসেম্বর, ১৯৭১ সংখ্যায় বাংলাদেশের বিজয়কে কভার স্টোরি হিসেবে প্রকাশ করে। শিরোনাম ছিল ‘দ্য ব্লাডি বার্থ অব বাংলাদেশ’ (The Bloody Birth of Bangladesh)। এই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে প্রায় ৪,২০০ শব্দে বর্ণনা করা হয় কীভাবে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের তীর থেকে শুরু করে সবুজ ধানক্ষেত পর্যন্ত ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল।
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা ছিল শিশুদের আনন্দ নিয়ে। তারা মিত্রবাহিনীর ট্যাঙ্ক ও ট্রাকের ওপর উঠে পড়েছিল এবং চারদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল ছবি শোভা পাচ্ছিল। প্রতিবেদনটি শেষ হয়েছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক কালজয়ী উদ্ধৃতি দিয়ে—”নিপীড়িত মানুষের বিজয় দেখার জন্যই বিশ্ব ইতিহাস অপেক্ষা করে।” এই বিজয় ছিল সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এক মহান অর্জন।
কেবল টেলিগ্রাফ বা নিউইয়র্ক টাইমস নয়, ‘দ্য মর্নিং স্টার’ শিরোনাম দিয়েছিল—’ইয়াহিয়া বাহিনী আত্মসমর্পণ করায় ঢাকায় নাচের উৎসব’। এছাড়া ‘নিউজউইক’, ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’, ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’, ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এবং রাশিয়ার ‘প্রাভদা’র মতো বড় বড় পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে ইতিহাসের অন্যতম বড় ঘটনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিবিসির হয়ে মার্ক টালি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করেছিলেন বিজয়ী ঢাকার চিত্র।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ছিল না, এটি ছিল বিশ্ব গণমাধ্যমের কলমে এক শোষিত জাতির পুনর্জন্মের আখ্যান। আজ যখন আমরা সেই দিনের ইতিহাস পড়ি, তখন এই বিশ্ব গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা কতটা মূল্যবান এবং গৌরবময়।

