সময়টা ছিল ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর ৪টা। কুয়াশাভেজা মাদারীপুরের বাহাদুরপুর গ্রাম যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, ঠিক তখনই অতর্কিত মরণকামড় দেয় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাহাদুরপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটি ক্যাম্প আছে-এমন নিশ্চিত খবর পেয়ে গ্রামটি ঘিরে ফেলে তারা।
শুরু হয় বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। সেই কালরাত্রিতে শিশু, নারী, বৃদ্ধ মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিনশো মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। রক্তগঙ্গার পাশাপাশি সেদিন ৪-৫টি গ্রামের কয়েকশো ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আজও সেই ভয়াবহতার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন তালুকদার। বিস্ময়কর হলেও সত্য, আজও তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে সেই পাক-বাহিনীর দেওয়া আগুনে পোড়া ঘরটি মেরামত করে বসবাস করছেন। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পার হলেও পোড়া ভিটেটি ছাড়েননি তিনি, যা আজও মনে করিয়ে দেয় একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় ভোরের কথা।
কেন্দুয়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নিরঞ্জন তালুকদার যুদ্ধ করেছেন ২ নম্বর সেক্টরের কিংবদন্তি ‘খলিল বাহিনীর’ অধীনে। একাত্তরের সেই রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি শিউরে ওঠেন। ঢাকা পোস্টকে তিনি জানান, হানাদাররা গ্রামে ঢুকে সামনে যাকে পেয়েছে তাকেই গুলি করেছে।
“আমরা খবর পেয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করি, কিন্তু তাদের অতর্কিত হামলার তীব্রতা ছিল প্রচণ্ড। আমরা গ্রামবাসীকে দ্রুত সরে যেতে বলি। জীবন বাঁচাতে কেউ পুকুরে ঝাঁপ দেয়, কেউ বিলের দিকে পালিয়ে যায়। হানাদাররা গ্রামের কয়েকজন ছেলেকে ধরে নিয়ে আমার বাড়িটি চিনিয়ে নেয় এবং সেখানে আগুন লাগিয়ে দেয়। বাড়ির মায়া ছেড়ে আমরা বিলে অবস্থান নিই, কিন্তু চোখের সামনেই জ্বলতে দেখি সাজানো সংসার। সেদিন প্রায় দুই শতাধিক বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল তারা।”
বীর মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন তালুকদার জানান, তাঁর দুই ছেলে সরকারি চাকরি করায় সরকারি ‘বীর নিবাস’ প্রকল্পের ঘর তাঁকে দেওয়া হয়নি। ফলে স্মৃতির সেই পোড়া ঘরটিই আজও তাঁর একমাত্র ঠিকানা।
বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সম্পর্কে নিরঞ্জন তালুকদার বলেন, একাত্তরের ৮ থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের সমাদ্দার ব্রিজের দুপাশে খলিল বাহিনীর সঙ্গে পাক-বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ চলে। সেই লড়াইয়ে গ্রেনেড ছুড়ে পাক-বাহিনীর বাঙ্কার ধ্বংস করতে গিয়ে শহীদ হন বাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ সদস্য সরোয়ার হোসেন বাচ্চু। ১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যার দিকে খলিল বাহিনীর প্রধান খলিলুর রহমান খানের কাছে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। মাদারীপুর জেলা সেদিনই হানাদারমুক্ত হয়। নিরঞ্জন তালুকদার গর্ব করে বলেন, “সারা দেশের মধ্যে খলিল বাহিনীই একমাত্র বেসামরিক বাহিনী, যাদের কাছে পাক-বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল।”
স্মৃতিস্তম্ভ থাকলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন এই বীর যোদ্ধা। তিনি বলেন, “বাহাদুরপুরে একটি বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু অনেকেই জানে না এর নেপথ্যের ইতিহাস। আমি ব্যক্তিগতভাবে এলাকার স্কুলে গিয়ে নাতি-নাতনিদের গল্প শোনাই। তাদের বলি, এই মাটিতেই শত শত নিরপরাধ মানুষকে একদিনে হত্যা করা হয়েছিল। তরুণ প্রজন্ম যদি এখনই এই ইতিহাস না জানে, তবে একদিন সব স্মৃতি মুছে যাবে।”
খলিল বাহিনীর প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমান খান একাত্তরের সেই কঠিন যাত্রার স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, “আমরা ১৬৫ জন ছাত্র মাদারীপুর নাজিমউদ্দীন কলেজ থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হই। তিন দিন তিন রাত হেঁটে ভারত গিয়ে প্রশিক্ষণ নিই। ১৮ মে মাদারীপুর ফিরে চার ভাগে বিভক্ত হয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করি। বাহাদুরপুর ক্যাম্প ছিল আমাদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি।”
তিনি আরও জানান, সমাদ্দার ব্রিজের যুদ্ধে ৩৬ জন পাকিস্তানি সেনা তাঁর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। সেই যুদ্ধে শহীদ সরোয়ার হোসেন বাচ্চুসহ ১৩৫ জন শহীদের নাম তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের স্মৃতি রক্ষার্থে সমাদ্দার ব্রিজ ও বাহাদুরপুরে পৃথক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।
বিজয় দিবসের ৫৪ বছর পূর্তিতে নিরঞ্জন তালুকদারের সেই পোড়া ঘরটি কেবল একটি জীর্ণ বাসস্থান নয়, বরং তা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল্য এবং আত্মত্যাগের এক জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

