শুক্রবার দুপুরের পর রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকার চিত্রটি ছিল বেশ সরগরম। জুমার নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই উত্তর গেটের সামনে জড়ো হতে থাকেন হাজারো মানুষ। ব্যানার আর ফেস্টুনে ছেয়ে যায় চারপাশ। জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি কড়া বার্তা দেওয়া। ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার বিরুদ্ধে’ ডাকা এই প্রতিবাদ সমাবেশে মূল আকর্ষণ ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন রিজভী।
সমাবেশটিতে সভাপতিত্ব করেন ওলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা গাজী মো. সেলিম রেজা। তবে সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রিজভীর বক্তব্য। অত্যন্ত দৃঢ় এবং তীক্ষ্ণ ভাষায় তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের পরতে পরতে ছিল হুশিয়ারি এবং নতুন সরকারের প্রতি অবিচল আস্থার প্রতিফলন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কারও কাছে মাথা নত করবে না।
মাইক্রোফোন হাতে নিয়েই রুহুল আমিন রিজভী সরাসরি আক্রমণ করেন সেইসব অদৃশ্য শক্তিকে, যারা দেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক ধারাকে ব্যাহত করতে চাইছে। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, এই স্বাধীন ভূখণ্ডে দেশবিরোধী বা গণতন্ত্রবিরোধী কোনো শক্তির বিন্দুমাত্র স্থান নেই। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে যারা বিকিয়ে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। তাঁর মতে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে যারা উপনিবেশ বানানোর দুঃস্বপ্ন দেখছে, তাদের সেই স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়িত হতে দেওয়া হবে না।
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা হুশিয়ার করে বলেন, বাংলাদেশকে যারা একটি তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, তাদের পথ আর মসৃণ নেই। জাতীয়তাবাদী ওলামা দল এবং বিএনপির লাখো কর্মী আজ জাগ্রত। তারা দেশের প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি মোড়ে এবং পথে-প্রান্তরে কঠিন ব্যারিকেড গড়ে তুলবে। কোনো বিদেশি শক্তির ক্রীড়নক হয়ে যারা দেশের ভেতর অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের রাজপথেই শক্ত হাতে মোকাবিলা করার কড়া বার্তা দেন রিজভী।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে রিজভী দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে দৃষ্টি ঘোরান। সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি। এই ভাষণটিকে তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই পরিবারের তিন প্রজন্মের বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করার এক বিরল ইতিহাসের কথা তিনি উপস্থিত জনতার সামনে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
রিজভী স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই ধারাবাহিকতার শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। সেই বছর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের হয়ে কথা বলেছিলেন। এরপর ১৯৯২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া একই মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর আজ, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর তাদেরই জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার কথা অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সেই ভাষণের মূল নির্যাসগুলো সাধারণ মানুষের ভাষায় ব্যাখ্যা করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তারেক রহমান বিশ্বনেতাদের প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা ছিল মূলত শান্তির সপক্ষে এক জোরালো অবস্থান। অস্ত্রের ঝনঝনানি আর সংঘাতের বদলে যুক্তি, কূটনীতি, আধুনিক শিক্ষা আর মানবতাকে বিশ্ব পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যে প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, রিজভী তাকে ‘অসাধারণ ও যুগান্তকারী’ বলে অভিহিত করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সমমর্যাদার নীতির কথাও উঠে আসে রিজভীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রতিটি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সমমর্যাদা ও শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে। এখানে কেউ কারও প্রভু নয়, বরং সবাই স্বাধীন ও সমান। এই নীতির মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বলন্ত ইস্যু ফিলিস্তিন সংকট নিয়েও সরকারের আপসহীন অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন রিজভী। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে যেভাবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো দাবি তুলেছেন, তা দেশের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষের মনের কথারই প্রতিফলন। ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা দীর্ঘদিনের আগ্রাসন বন্ধ করে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এই দাবি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের অন্যতম প্রধান সংকট রোহিঙ্গাদের বিষয়েও কথা বলেন রুহুল আমিন রিজভী। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা রিফিউজিদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। তিনি জানান, এই মুসলিম রোহিঙ্গাদের পূর্ণ মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
বিশ্ব রাজনীতির সংঘাত কীভাবে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তার একটি চমৎকার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণও দাঁড় করান রিজভী। তিনি বলেন, সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষ আজ কেবল শান্তি চায়, তারা কোনো যুদ্ধ বা রক্তপাত চায় না। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুদ্ধ বাধলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের বাজার ব্যবস্থায়। যুদ্ধ মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়া।
তিনি সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে বলেন, যুদ্ধের কারণেই দেশে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়ে। খাদ্যপণ্যের বাজার হয়ে ওঠে লাগামহীন। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেখা দেয়। আর এই জ্বালানি সংকটের কারণে কলকারখানাগুলো উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। নীলকল থেকে শুরু করে ভারী শিল্প—সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বেকারত্ব।
এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেই রিজভী দেশের ভেতরের অস্থিতিশীলতার ষড়যন্ত্রকারীদের দিকে আঙুল তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে আগুন দিয়ে গাড়ি পুড়িয়ে এবং নাশকতা সৃষ্টি করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে চাইছে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের যে স্বাভাবিক ধারা দেশে বইতে শুরু করেছে, সেই ধারাকে রুদ্ধ করার জন্যই এই পরিকল্পিত সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের এই সমাবেশ মূলত সেইসব নৈরাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধেই এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা।
দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থার বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অতীতের স্বৈরাচারী শাসনামলের তীব্র সমালোচনা করেন রিজভী। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, বর্তমান বিএনপি সরকার কোনো পাতানো বা সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি। রাতের আঁধারে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করা কোনো ‘মিডনাইট নির্বাচন’ দিয়েও এই সরকার গঠিত হয়নি। বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বিএনপি।
বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত এই সরকার জনগণের নিজস্ব সরকার বলে দাবি করেন তিনি। জনগণের শতভাগ ভোটের নিশ্চয়তা ও ম্যান্ডেট নিয়েই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আজ রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এই সরকার কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় নয়, বরং দেশের আপামর জনসাধারণের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষায় জোর দিয়ে প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের যে ধারা শুরু হয়েছে, তা কোনো ষড়যন্ত্রের কাছেই থেমে যাবে না।
বক্তব্যের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে রিজভী দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা বসে নেই, তারা নিত্যনতুন ছকে দেশকে পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশের জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা তাদের কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে আর কোনোভাবেই ছিনতাই হতে দেবে না। আর এই প্রতিরোধ যুদ্ধে বিএনপি এবং এর সব অঙ্গসংগঠন সবসময় সাধারণ মানুষের ঢাল হয়ে রাজপথে থাকবে।
তাঁর এই জ্বালাময়ী বক্তব্যের পর সমাবেশস্থলে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। উপস্থিত হাজারো জনতা দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার স্লোগানে স্লোগানে পুরো বায়তুল মোকাররম এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে। সমাবেশ শেষে ওলামা দলের নেতৃত্বে মসজিদ প্রাঙ্গণের উত্তর গেট থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি রাজধানীর পল্টন মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
এই মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে বিএনপি মূলত তাদের রাজনৈতিক বিরোধীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলকেও একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা পৌঁছে দিল। তারা বুঝিয়ে দিল যে, দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। যেকোনো ধরনের নাশকতা বা বিদেশি হস্তক্ষেপ তারা রাজনৈতিকভাবেই অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করবে। বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এই লড়াইয়ে পিছু হটার কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই।

