ঝিনাইদহ শহরের রাজনৈতিক আকাশে নতুন করে উত্তেজনার মেঘ জমতে শুরু করেছে। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই রাজনৈতিক শিবিরের পাল্টাপাল্টি মামলার ঘটনায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতার ওপর হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দলটির ৬০ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা ঠুকে দিয়েছে জেলা ছাত্রদল।
শনিবার (২৩ মে) দুপুরে ঝিনাইদহ সদর থানায় এই মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজাসহ ২২ জনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা ছাত্রদলের সদস্য এবং সাবেক সহ-সভাপতি এনামুল কবির বাদী হয়ে থানায় এই এজাহার জমা দেন।
পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই মামলার পটভূমি তৈরি হয়েছিল মূলত গত শুক্রবার দুপুরে। জুম্মার নামাজকে কেন্দ্র করে শহরের একটি মসজিদে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তারই ধারাবাহিকতায় ঝিনাইদহের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের শক্তিমত্তার মহড়াও দিচ্ছে।
মসজিদের বাইরে ডিম নিক্ষেপ ও হামলার সূত্রপাত
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত শুক্রবার দুপুরে ঝিনাইদহ শহরের পুরাতন কালেক্টরেট জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতে যান এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা। নামাজ শেষ করে তারা যখন মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বাইরে ওত পেতে থাকা একদল যুবক তাদের ওপর অতর্কিত চড়াও হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আচমকা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ শুরু করে একদল তরুণ। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এই হামলায় এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। মসজিদের মতো একটি পবিত্র স্থানের সামনে এমন বিশৃঙ্খল ঘটনায় সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
হামলার ঘটনার পর পরই শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এনসিপির নেতাকর্মীরা এই ঘটনার জন্য সরাসরি ছাত্রদলকে দায়ী করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা দুপুরের পর থেকেই দলবল নিয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় গিয়ে অবস্থান নেন। হামলাকারীদের গ্রেফতার এবং সুনির্দিষ্ট মামলার দাবিতে দলটির শীর্ষ নেতারা দুপুরের পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত থানার ভেতর অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন।
পুলিশের পাহারায় শহর ছাড়লেন এনসিপি নেতা
দীর্ঘ সময় থানায় অবস্থানের পর শুক্রবার গভীর রাতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে এনসিপি। মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কায় জেলা পুলিশ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আয়োজন করে। রাত ১০টার দিকে পুলিশের কড়া পাহারায় ঝিনাইদহ শহর ত্যাগ করেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তার সফরসঙ্গীরা।
এনসিপির করা মামলায় নিজেদের নেতাকর্মীদের আসামি করার খবরটি জানার পর শনিবার সকাল থেকেই পাল্টা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে জেলা ছাত্রদল। ছাত্রদলের স্থানীয় নেতাদের দাবি, শুক্রবারের ঘটনায় তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল সেখানে। কিন্তু এনসিপি রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লুটতে ছাত্রদলের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে।
এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জবাব দিতেই শনিবার দুপুরে ছাত্রদল নেতা এনামুল কবির বাদী হয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় পাল্টা এজাহার জমা দেন। যেখানে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা তারেক রেজাকে প্রধান আসামি করে দলটির স্থানীয় কর্মীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। পুলিশ কোনো ধরণের কালক্ষেপণ না করেই ছাত্রদলের এই অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে।
গ্রেফতার আতঙ্কে ঘরছাড়া উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদউজ্জামান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ছাত্রদল নেতা এনামুল কবিরের দেওয়া এজাহারটি গভীর পর্যালোচনার পর মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। দুই পক্ষ থেকেই মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত সাপেক্ষে আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।”
এদিকে, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি বড় রাজনৈতিক মামলার কারণে ঝিনাইদহ শহর ও এর আশপাশের এলাকায় এক ধরণের অঘোষিত থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গ্রেফতার আতঙ্কে দুই দলেরই মাঝারি ও মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী ইতিমধ্যে ঘরছাড়া হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ছাত্রদল ও এনসিপির স্থানীয় কার্যালয়গুলোতে চিরচেনা আড্ডার দৃশ্য উধাও হয়ে গেছে।
স্থানীয় সাধারণ নাগরিকেরা বলছেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঝিনাইদহে এক ধরণের শান্তি ফিরে এসেছিল। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপির সাথে ঐতিহ্যবাহী ছাত্রদলের এই সংঘাত শহরের ব্যবসায়িক ও সামাজিক পরিবেশকে আবারও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তারা যেকোনো ধরণের সহিংসতা এড়াতে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
আইনি লড়াইয়ের আড়ালে মাঠ দখলের রাজনীতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি মামলার ঘটনাটি কেবল একটি ডিম নিক্ষেপ বা মারামারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে ঝিনাইদহের স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের এক অলিখিত লড়াই। নতুন বাস্তবতায় এনসিপি যখন দেশের বিভিন্ন জেলায় নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করতে চাইছে, তখন পুরনো ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের এই আগমনকে সহজভাবে নিতে পারছে না।
শনিবার বিকেলে জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এনসিপির কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে এসে ঝিনাইদহের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে। তারা ছাত্রদলের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে মিথ্যা মামলার আশ্রয় নিয়েছে। আইনিভাবেই এই ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করা হবে বলে তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
অন্যদিকে, এনসিপির স্থানীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে হামলা করা হলো, তা প্রমাণ করে দেশে এখনো মস্তানি রাজনীতি বন্ধ হয়নি। আমরা শান্তির রাজনীতি করতে এসেছি। কিন্তু আমাদের ওপর হামলা চালিয়ে উল্টো আমাদের নামেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।” ঝিনাইদহ সদর থানা পুলিশ জানিয়েছে, যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

