৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগী শক্তির সঙ্গে দেশের একটি রাজনৈতিক পক্ষ গোপনে হাত মিলিয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। চলমান অস্থিরতার পেছনে এই গোপন আঁতাত বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তিনি।
শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বৈলর ইউনিয়নের কানহর এলাকায় এক বিশাল জনসমাবেশে সরকারপ্রধান এই মন্তব্য করেন। এর আগে তিনি সেখানে কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে ঐতিহাসিক ‘ধরার খাল’ পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
বিরোধীদের কড়া সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, এখন যারা মাঠে অরাজকতা তৈরি করতে চাইছে, খোঁজ নিয়ে দেখুন, ৫ আগস্টে যারা বিতাড়িত হয়েছিল, তাদের সঙ্গেই এরা তলে তলে আবার খাতির শুরু করেছে। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক চক্রান্ত রয়েছে।
পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও নতুন ‘লেজ’
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী অতীতের কিছু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, এই ধরনের ষড়যন্ত্র বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ১৯৯৬ সালে এবং তারও আগে ১৯৮৬ সালে যেভাবে ক্ষমতার লোভে ব্যাকডোর দিয়ে আঁতাত করা হয়েছিল, ঠিক একই দৃশ্য আমরা আবারও দেখতে পাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, বিতাড়িত স্বৈরাচারের দোসরদের সঙ্গে এখন নতুন কয়েকটি ‘লেজ’ গজিয়েছে। এরা সবাই মিলে দেশের চলমান স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে নসাৎ করার চেষ্টা করছে। দেশের মানুষকে এই অপশক্তি সম্পর্কে সর্বদা সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে যে স্বৈরাচার বিদায় নিয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের কোনো চেষ্টা এ দেশের মানুষ সফল হতে দেবে না। যারা অরাজকতা করছে, তাদের মূল উদ্দেশ্য জনকল্যাণ নয়, বরং ক্ষমতা কুক্ষিগত করা।
আইনি প্রক্রিয়া ও রাজপথের বিশৃঙ্খলা
কয়েক দিন আগে ঢাকায় ঘটে যাওয়া শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তিন-চার দিন আগে রাজধানীতে একটি অত্যন্ত অন্যায় ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। আমরা প্রথম থেকেই বলছি, আইনের চোখে অপরাধী যে-ই হোক, তার কঠোর শাস্তি পেতে হবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেকোনো কাজ করার একটা সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকে। আপনি যদি ধান বা শাকসবজি চাষ করতে যান, তবে কখন বীজ বুনবেন, কখন পানি বা সার দেবেন, তার নিয়ম আছে। অন্যায়ের বিচার ও শাস্তির ক্ষেত্রেও সরকারের তেমন নিয়ম রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, গত কয়েকদিন ধরে কিছু মানুষ রাস্তাঘাট বন্ধ করে, যানবাহনে আগুন দিয়ে যে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে, তাতে কি আইনের শাসন কায়েম হচ্ছে? এরা আসলে আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিচ্ছে না, বরং বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
নির্বাচনের পর ‘জ্বালা’ ও মাঠের অনুপস্থিতি
১২ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও দেশে কয়েকটি দুঃখজনক ও অন্যায্য ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় আমি নিজে ভুক্তভোগী শিশুদের মায়েদের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ নিয়েছিলাম।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দলের চিকিৎসক ও আইনজীবীরা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ যারা রাজপথে হইচই করছেন, রাস্তা অবরোধ করে বড় বড় কথা বলছেন, সেদিন কিন্তু তাদের কাউকে আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখিনি।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, ১২ তারিখের নির্বাচনে দেশের জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। আর এই জনরায় মেনে নিতে না পেরেই একটি পক্ষের মনে চরম ‘জ্বালা’ তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই তারা এখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে।
গ্রামীণ অর্থনীতি ও জনকল্যাণ বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারপ্রধান বলেন, যারা এখন দেশে ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, তারা কিন্তু সাধারণ কৃষকদের সমস্যা নিয়ে কোনো কথা বলে না। তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই অরাজক পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে, তবে দেশজুড়ে শুরু হওয়া খাল খনন কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সাধারণ কৃষক। অস্থিতিশীলতার কারণে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের বিতরণ প্রক্রিয়া থমকে যাবে।
তারেক রহমান বলেন, অরাজকতা বাড়লে ইমাম, মোয়াজ্জিন, খতিব ও অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য সরকারের ঘোষিত সম্মানি বন্ধ হয়ে যাবে। গ্রামীণ শিশুদের বিনামূল্যে নতুন স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ দেওয়ার যে উদ্যোগ আমরা নিয়েছি, তাও বাধাগ্রস্ত হবে। চূড়ান্ত বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কেবল খেটে খাওয়া মানুষ।
স্বৈরাচার বিদায় ও দেশ গঠনের ডাক
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ ও ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। যে শাসনব্যবস্থা মানুষের ভোটের অধিকার ও কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল, দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে তাকে উৎখাত করেছে।
তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকার খেটে খাওয়া মানুষের সব ধরনের উন্নয়ন বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন সময় এসেছে ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশটাকে নতুন করে গড়ে তোলার। দেশের মানুষের ভাগ্যের টেকসই পরিবর্তন করতে হলে আমাদের সামগ্রিক শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী এক অনন্য অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরে বলেন, আমাদের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে সম্পূর্ণ সক্রিয় ও উৎপাদনমুখী করে তুলতে হবে। প্রতিটি হাতকে দক্ষ শ্রমিকের হাতে রূপান্তর করতে হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করবে।
৪০ কোটি হাতের অর্থনৈতিক শক্তি
তারেক রহমান দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জনশক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আমাদের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ৪০ কোটি হাত দিয়ে নতুন ব্রিজ, কালভার্ট, আধুনিক স্কুল, কলেজ ও উন্নত হাসপাতাল তৈরি করতে হবে। তবেই গ্রামীণ ও শহরের বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে।
তিনি উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করে বলেন, কোনো ষড়যন্ত্রই সরকারের এই উন্নয়ন যাত্রাকে থামাতে পারবে না। দেশের প্রতিটি নাগরিক যদি নিজের অবস্থান থেকে উৎপাদনশীল কাজে অংশ নেয়, তবে অতি দ্রুত বাংলাদেশ একটি স্বনির্ভর ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র হাত ধরাধরি করে চলে। আমরা জনগণের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছি, এখন অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে যেকোনো ধরণের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
৪৭ বছর পর বাবার স্মৃতিবিজড়িত খালের পুনঃখনন
শনিবারের এই কর্মসূচির পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি। ১৯৭৯ সালে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে দেশব্যাপী ‘খাল খনন কর্মসূচি’ শুরু করেছিলেন। সেই সময় তিনি নিজে ত্রিশালের এই ‘ধরার খাল’ খনন করেন।
দীর্ঘ ৪৭ বছর পর পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া সেই খালটি পুনঃখননের উদ্যোগ নিলেন তারই সুপুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার দুপুর ২টা ২১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছান। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকা সত্ত্বেও তিনি সরাসরি মাঠ পরিদর্শনে যান এবং গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই খালের মাটি কেটে কাজের উদ্বোধন করেন।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দিত। প্রধানমন্ত্রী নিজে এসে এই খালের খনন কাজ শুরু করায় এলাকার হাজার হাজার কৃষক পরিবারের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হতে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় ও দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি
ত্রিশালের এই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মসূচিতে সরকারের মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং নীতিনির্ধারক উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রাশেদুজ্জামান মিল্লাত এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ত্রিশাল আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান, ময়মনসিংহ সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, মুক্তাগাছা আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জাকির হোসেন এবং গফরগাঁও আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান। অনুষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন এবং ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান।

