আকাশ জুড়ে তখন মেঘের ঘনঘটা। দুপুরের পর থেকেই শুরু হয়েছিল গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির মধ্যেই কাদা-জল মাড়িয়ে খালের পাড়ে এসে দাঁড়ালেন সরকারপ্রধান। হাতে তুলে নিলেন কোদাল। ৪৭ বছর আগে ঠিক এই মাটিতেই দাঁড়িয়েছিলেন তার বাবা। ইতিহাসের সেই চেনা বৃত্ত সম্পূর্ণ করতেই যেন চার দশকেরও বেশি সময় পর আবার এখানে ফেরা।
শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বৈলর ইউনিয়নের কানহর এলাকায় এক আবেগঘন ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী হলেন স্থানীয় মানুষ। সেখানে ‘ধরার খাল’ পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১৯৭৯ সালে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বহস্তে এই খালটি খনন করেছিলেন। বাবার সেই স্মৃতিবিজড়িত জনকল্যাণমূলক কাজটিকেই নতুন মেয়াদে এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিলেন ছেলে।
খাল খননের উদ্বোধন শেষে স্থানীয় কানহর মাঠে এক বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে দেওয়া প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সুশাসন এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে অত্যন্ত কঠোর ও সজাগ বার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বার্থ রক্ষায় বর্তমান সরকার কোনো ধরনের আপস করবে না। যেকোনো মূল্যে দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে।
দেশের মালিক জনগণ, ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতেই দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় সাধারণ মানুষের ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, এই স্বাধীন বাংলাদেশের একমাত্র প্রকৃত মালিক হচ্ছে এ দেশের সাধারণ জনগণ। কোনো কতিপয় গোষ্ঠী বা বিশেষ মহল জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে, সেই দিন এখন আর নেই। অতীতে মানুষের ভাগ্য নিয়ে অনেক খেলা হয়েছে, কিন্তু বর্তমান সরকার তা আর কোনোভাবেই হতে দেবে না।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সবসময় জনগণের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। আমরা জনগণকে সাথে নিয়েই এ দেশের মানুষের ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন করতে চাই। আজ সেই সময় এসেছে যখন একদিকে আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো সফল করতে হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, আমাদের সকলকে প্রতিটি মুহূর্তে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। কিছু মানুষ সমাজে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। তারা ভাবছে কায়দা করে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সফল হয়ে যাবে। কিন্তু সচেতন দেশবাসী তাদের সেই চক্রান্ত কোনোদিনই সফল হতে দেবে না। জনগণ এখন অনেক বেশি পরিপক্ব।
ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও আইনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে চলা অপপ্রচারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দেশে দীর্ঘ সময় পর আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাকে বাধাগ্রস্ত করতে একটি মহল মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা নানা ধরণের গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা মানুষের জন্য গৃহীত সরকারের প্রতিটি কল্যাণমুখী কর্মসূচিকে নসাৎ করার জন্য বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তাদের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষকে সবসময় সজাগ থাকতে হবে। এই বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীরা আসলে দেশের শত্রু, জনগণের শত্রু। তারা চায় না এ দেশের সাধারণ মানুষ শান্তিতে থাকুক বা দেশের শাসনব্যবস্থায় এক ধরণের স্থিতি ফিরে আসুক।
প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, যারা জনগণের সাথে থাকবে, জনগণের পাশে থাকবে এবং নিবিড়ভাবে মানুষের সুখ-দুঃখে কাজ করবে, বাংলাদেশের মানুষ কেবল তাদেরকেই সাথে রাখবে। আর সেই দেশপ্রেমিক জনগণকে সাথে নিয়েই এই দেশকে যেকোনো ধরণের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করা হবে। চক্রান্তকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
দেশটা আমাদের নিজেদের খামারবাড়ির মতো
এক অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল উদাহরণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতি নাগরিকদের দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি মানুষ যেভাবে নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তার নিজের ক্ষেত-খামার, নিজের ঘরবাড়ি গড়ে তোলে, ঠিক সেভাবেই এই দেশটাকে আমাদের সবাইকে মিলে গড়ে তুলতে হবে। দেশটা কোনো বাইরের কারও নয়, এটা আমাদের সকলের নিজের বাড়ি।
তিনি সমাবেশে উপস্থিত হাজারো মানুষের দিকে তাকিয়ে বলেন, এখানে আজ আমরা যত মানুষ উপস্থিত আছি, প্রত্যেকেই হচ্ছে এই স্বাধীন বাংলাদেশের সমান অংশীদার, প্রত্যেকেই হচ্ছে এই দেশের মালিক। কাজেই আমার নিজের ঘর যেভাবে আমাকেই পাহারা দিয়ে দেখতে হয়, ঠিক একইভাবে আমাদের এই প্রিয় দেশটাকেও আমাদের নিজেদেরকেই রক্ষা করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, আমাদের দেশের স্বাধীনতা, আমাদের দেশের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব এবং আমাদের দেশের খেটে খাওয়া মানুষের স্বার্থ আমরা অন্য কারও হাতে ছেড়ে দিতে পারি না। আমাদের স্বার্থ আমাদেরকেই দেখতে হবে। আজ থেকে আমাদের এই প্রতিজ্ঞা নিতে হবে যে, কোনো অপশক্তি যেন আমাদের এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে না পারে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে বাধার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি
আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন ও বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন। অপরাধী যে-ই হোক, তার স্থান হবে কারাগারে। কিন্তু আমরা দেখছি, সুনির্দিষ্ট কিছু অপরাধীর বিচার শুরু হতেই একটি গোষ্ঠী মানুষের মধ্যে নানামুখী বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, যারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথকে কোনো না কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করছে, যারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন কোনো ধরণের উসকানি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টাকে কঠোর হাতে দমন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, দেশের বিচার বিভাগ এখন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে। জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্য পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং এতে কোনো বাধা বরদাশত করা হবে না।
৪৭ বছর পর বাবার খালের পুনঃখনন
শনিবারের এই কর্মসূচির পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক ও আবেগঘন পটভূমি। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষির উন্নয়নে দেশজুড়ে ‘খাল খনন কর্মসূচি’ শুরু করেছিলেন। সেই সময় ময়মনসিংহের ত্রিশালের এই ‘ধরার খাল’ তিনি নিজে স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে খনন করেন, যা দীর্ঘ চার দশকে পলি জমে ভরাট হয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ ৪৭ বছর পর বাবার সেই স্মৃতিবিজড়িত ও জনগুরুত্বপূর্ণ খালটি পুনঃখননের উদ্যোগ নিলেন তারই সুপুত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার দুপুর ২টা ২১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছান। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকা সত্ত্বেও তিনি সরাসরি মাঠ পরিদর্শনে যান এবং গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই খালের মাটি কেটে পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করেন।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, এই ধরার খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে গত দুই দশকে এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দিত। প্রধানমন্ত্রী নিজে এসে এই খালের খনন কাজ শুরু করায় এলাকার হাজার হাজার কৃষক পরিবারের মুখে হাসি ফুটেছে এবং কৃষিতে নতুন জোয়ার আসবে বলে তারা আশা করছেন।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি
ত্রিশালের এই ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে সরকারের মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সদস্য এবং নীতি নির্ধারক উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রাশেদুজ্জামান মিল্লাত এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। কেন্দ্রীয় নেতাদের এই ব্যাপক উপস্থিতি স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ত্রিশাল আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান, ময়মনসিংহ সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, মুক্তাগাছা আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জাকির হোসেন এবং গফরগাঁও আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান।
অনুষ্ঠানের প্রশাসনিক সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন এবং ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। উদ্বোধনী পর্ব ও সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং কৃষি উদ্যোক্তাদের সাথে খালের পাড়েই এক সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় মিলিত হন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন।

