রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে খুনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই জঘন্য অপরাধের বিচার নিয়ে রাষ্ট্র যে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করবে না, সেই কড়া বার্তাও দিয়েছেন সরকারপ্রধান। অপরাধীর জন্য দেশের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২৩ মে) বিকেলে ময়মনসিংহের ত্রিশালের ঐতিহাসিক নজরুল মঞ্চে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তিন দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় উৎসবের উদ্বোধনের পাশাপাশি এদিন নজরুল পুরস্কার-২০২৫ প্রদান করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, কোনো শিশু বা নারীর ওপর এমন পৈশাচিক বর্বরতা বর্তমান সরকার কোনোভাবেই বরদাশত করবে না। অপরাধীদের আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যাওয়ার চেনা সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার আগামী এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন করে খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা জানান তিনি।
অপরাধীদের জন্য কঠোরতম বার্তা
জনাকীর্ণ কবি মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে যে অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে, তা দূর করতে হলে কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি। রামিসার হত্যাকারী সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এই শাস্তি দেখে যেন ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি বা অপরাধী চক্র শিশু কিংবা নারীর ওপর হাত তোলার সাহস না পায়।
তিনি বলেন, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে অবুজ শিশুদের সুরক্ষায় আইনি প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করা হচ্ছে। রামিসা হত্যা মামলার তদন্ত ইতিমধ্যেই শেষ পর্যায়ে এসেছে এবং দ্রুততম সময়ে এর রায় ঘোষণা ও বাস্তবায়নের জন্য আদালতকে অনুরোধ জানাবে সরকার।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নৈতিক মূল্যবোধের যে চরম বিপর্যয় আমরা চারপাশে লক্ষ্য করছি, তা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হবে। আইনের কঠোর শাসনের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার ওপর জোর দেন তিনি। অপরাধী যে-ই হোক, তার কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।
ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ করার রূপরেখা
জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে তুলে ধরার এক বড় পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাম্য ও দ্রোহের কবি নজরুল কেবল বাঙালির নন, তিনি সারা বিশ্বের শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর। তার জীবনদর্শন ও কালজয়ী সাহিত্যকর্ম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
এই লক্ষ্যে ত্রিশাল উপজেলা এবং এর আশপাশের কবি স্মৃতিবিজড়িত অঞ্চলগুলোকে একীভূত করে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নজরুল সিটি’ বা নজরুল নগরী হিসেবে গড়ে তোলা যায় কিনা, সে বিষয়ে একটি বিশদ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে এই কাজ শুরু করতে বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, নজরুল সিটি প্রতিষ্ঠিত হলে তা কেবল পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটাবে না, বরং দেশ-বিদেশের গবেষকদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। কবির শৈশবের স্মৃতিগুলোকে নতুন রূপ দিয়ে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে তরুণেরা নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারে।
দুই দশক পর রাষ্ট্রীয় আয়োজন ও ইতিহাস স্মরণ
নজরুল স্মরণে আক্ষেপ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের এক বিশাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দীর্ঘ উদাসীনতার কারণে ২০০৬ সালের পর থেকে ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে কোনো বড় নজরুল জয়ন্তী উদযাপিত হয়নি। প্রায় দুই দশক ধরে এই অবহেলা চলেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুনরায় এই ঐতিহাসিক স্থানে রাষ্ট্রীয়ভাবে কবির জন্মোৎসব আয়োজন করতে পেরে গর্ববোধ করছে।
তিনি ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু অজানা এবং আবেগঘন স্মৃতি উপস্থিত জনতার সামনে তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করেন, ১৯১৪ সালে মরহুম দারোগা রফিজ উল্লাহ কীভাবে বালক কবি নজরুলকে ত্রিশালের কাজির শিমলা গ্রামে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং তার পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই ঋণ ও ইতিহাস বাঙালি কখনো ভুলবে না।
একই সঙ্গে তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ১৯৭৬ সালে ঢাকার শেরে বাংলা নগরের জাতীয় ঈদগাহ মাঠে কবির জানাজার পর তার লাশবাহী খাটিয়া যারা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। কবির প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ছিল নিখাদ।
জিয়া পরিবার ও নজরুলের স্মৃতি রক্ষা
তারেক রহমান আরও জানান, ১৯৭৯ সালের ২৫ মে জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকার ফার্মগেট থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অবস্থিত কবির মাজার পর্যন্ত এক বিশাল বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক পদযাত্রায় নিজে উপস্থিত থেকে অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান।
এর পরবর্তী সময়ে দেশের শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ত্রিশালের মাটিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, গুণী মানুষকে সম্মান জানালে নিজের সম্মান কখনো কমে না, বরং বিনয় মানুষকে মহিমান্বিত করে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান সমাজ এই মহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শগুলো থেকে দূরে সরে গেছে বলেই চারপাশের এই অস্থিরতা ও অবক্ষয়। সংস্কৃতির চর্চা না থাকলে মানুষ ক্রমান্বয়ে অমানুষে পরিণত হয়, যার প্রতিফলন আমরা পল্লবীর মতো নির্মম হত্যাকাণ্ডে দেখতে পাচ্ছি। নজরুল চর্চায় ফিরে আসাই এই সংকটের অন্যতম সমাধান।
বাংলাদেশ ও নজরুল এক অবিভাজ্য সত্তা
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষ অংশে কবির দর্শনের গভীরতা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মের পেছনে এবং আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল স্তম্ভে কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে জড়িয়ে আছেন। তিনি আমাদের জাতীয় চেতনার প্রধান প্রতীক ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান প্রেরণা।
তিনি আহ্বান জানান, জাতীয় কবির এই জন্মদিনে আমাদের শপথ নিতে হবে যেন সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার, ক্ষুধা, দারিদ্র এবং সব ধরণের মানবিক গ্লানি মুছে ফেলা যায়। সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সবার আগে মন ও মগজে বাংলাদেশকে ধারণ করার জন্য তিনি তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান। আগামী ২৫ মে কবির মূল জন্মবার্ষিকীতে দেশজুড়ে ব্যাপক কর্মসূচি পালনের কথা বলেন তিনি।
নজরুলকে সাহিত্য দিগন্তের এক নতুন পথপ্রদর্শক উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কবি তার কবিতার মাধ্যমে যেভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের জয়গান গেয়েছেন, তা আজ বিশ্ব রাজনীতিতেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। শোষণের বিরুদ্ধে নজরুলের কবিতা এখনো শাণিত অস্ত্রের মতো কাজ করে।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ত্রিশাল আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান। জাতীয় কবির জীবন ও সাহিত্যের ওপর মূল স্মারক বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর।
অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবির পৌত্রী এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান খিলখিল কাজী। তিনি তার বক্তব্যে কবির পারিবারিক স্মৃতি ও তার অপ্রকাশিত কাজগুলো সংরক্ষণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এছাড়া বক্তব্য দেন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। অনুষ্ঠান শেষে সমাপনী ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। উদ্বোধনী পর্ব শেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীরা কবির গান ও কবিতা পরিবেশন করেন।

