ছুটির দিনের অলস সকালটা মুহূর্তেই রূপ নিল বিভীষিকায়। চাকার নিচে পিষ্ট হলো আরও কিছু সাধারণ জীবন, যার কোনোটিরই হয়তো আজ এভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল না। দেশের পাঁচ জেলার পিচঢালা পথ আজ আবার রক্তে লাল হলো। শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, যশোর, ফরিদপুর ও গাজীপুরের মহাসড়কগুলো আজ যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছিল। নিহতের সংখ্যার পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও বহু মানুষ। নিথর দেহগুলোর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে দেশের বেশ কয়েকটি হাসপাতালের বাতাস।
প্রতিটি দুর্ঘটনাই যেন আমাদের চেনা অব্যবস্থাপনা আর গতির প্রতিযোগিতার এক একটি নিষ্ঠুর উদাহরণ। কোথাও বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় যাত্রীবাহী বাস উল্টে গেল খাদে, কোথাও আবার বেপরোয়া কাভার্ডভ্যান কেড়ে নিল মোটরসাইকেল আরোহী কিশোরদের প্রাণ। পুলিশ ও হাইওয়ে থানার কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, গাড়ি জব্দ হয়েছে, কিন্তু যে প্রাণগুলো চলে গেল, তা আর ফেরার নয়।
কুষ্টিয়ায় বাসের সঙ্গে ট্রাকের ধাক্কা, খাদে পড়ে নিহত ৪
কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কে শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা। প্রায় ৫০ জন যাত্রী নিয়ে রাজবাড়ী থেকে কুষ্টিয়ার দিকে আসছিল তানহা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস। খোকসা থানার শিমুলিয়া এলাকার শিয়ালডাঙ্গি দক্ষিণ কুঠিপাড়া মসজিদের সামনে পৌঁছাতেই ঘটে সেই মহাবিপর্যয়। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ভ্যানকে বাঁচাতে গিয়ে বালুবোঝাই একটি ড্রাম ট্রাকের সঙ্গে বাসটির মুখোমুখি তীব্র সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের ধাক্কায় চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে বাসটি যাত্রীসহ রাস্তার পাশের গভীর খাদে উল্টে পড়ে যায়।
ভেতরে থাকা যাত্রীদের আর্তনাদ আর চিৎকারে স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে আসেন। তারা জানালার কাচ ভেঙে এবং পেছনের অংশ কেটে যাত্রীদের উদ্ধার করা শুরু করেন। খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কয়েকজনকে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তরের পথে আরও এক নারীর মৃত্যু হয়।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে দুজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর মন্ডলপাড়ার রুহুল আমিনের মেয়ে রাফিয়া (১৫) এবং খোকসা উপজেলার কমলাপুর গ্রামের জুনায়েদ আহম্মেদের ছেলে নাবিল (২৮)। বাকি দুই পুরুষের পরিচয় এখনো শনাক্ত করতে পারেনি প্রশাসন। খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. আরিফুল হক জানান, আহত ২০ জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল, যার মধ্যে আশঙ্কাজনক ছয়জনকে জেলা সদরে পাঠানো হয়। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. ইকবাল হোসেন জানান, সেখানে চিকিৎসাধীন বাকি চারজনের অবস্থাও বেশ সংকটাপন্ন।
দিনাজপুরে মোটরসাইকেল আরোহী তিন কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সকাল ৯টার দিকে ঘটে গেছে আরেকটি বুক ভাঙা ঘটনা। একটি মোটরসাইকেলে চেপে তিন কিশোর যাচ্ছিল রানীগঞ্জ বাজারের দিকে। দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কে মোটরসাইকেলটি ওঠা মাত্রই দিনাজপুর থেকে ছেড়ে আসা একটি দ্রুতগতির মালবাহী ট্রাক তাদের সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, তিন কিশোরই ছিটকে পড়ে পিচের রাস্তায়। ঘটনাস্থলেই পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায় তারা।
নিহতরা হলেন ঘোড়াঘাট আফসারাবাদ কলোনি এলাকার সমেশ উদ্দিনের ছেলে কাইয়ুম মিয়া (২০), মগলিশপুর এলাকার সলিমুদ্দিনের ছেলে সৈকত (১৫) এবং নুরপুর এলাকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে আলামিন (১৫)। ঈদের আগে এই তিন তরুণের এমন চলে যাওয়া পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে।
ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, ঘটনার পরপরই ঘাতক ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। চালক পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ট্রাকের হেলপারকে পুলিশ আটক করেছে। লাশগুলো উদ্ধার করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
যশোরে কাভার্ডভ্যান-ইজিবাইকের ত্রিমুখী সংঘর্ষে নারীসহ নিহত ৩
যশোর-খুলনা মহাসড়কে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চাউলিয়া তেলপাম্পের সামনে তৈরি হয় আরেক বীভৎস দৃশ্য। খুলনা থেকে যশোর অভিমুখে আসা একটি বেপরোয়া গতির কাভার্ডভ্যান হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে থাকা একটি ভ্যান ও যাত্রীবাহী ইজিবাইককে একসঙ্গে চাপা দেয়। তিনটি যানের এই ত্রিমুখী সংঘর্ষে ইজিবাইকটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
ঘটনাস্থলেই ইজিবাইক চালক মোহাম্মদ আইয়ুব আলী (৪৩) এবং আরোহী তরুণী বৃষ্টি সাহা (২৪) মারা যান। স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রক্তাক্ত অবস্থায় আহতদের উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চাউলিয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আনোর আলী (৭০) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই দুর্ঘটনায় বৃষ্টি সাহার চার বছর বয়সী শিশুপুত্র সৌভিক সাহা এবং মণিরামপুরের সাজ্জাদ হোসেন নামে আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। নওয়াপড়া হাইওয়ে থানার ওসি ফজলুল করিম জানান, দুর্ঘটনাকবলিত যানগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে।
ফরিদপুরে বাসচাপায় পথচারী শেষ, গাজীপুরে চালকের মৃত্যু
ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের চুমুরদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঘটে এক দুর্ঘটনা। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মহাসড়ক পার হচ্ছিলেন মো. খোকন ব্যাপারী (৪৮) নামে এক পথচারী। ঠিক তখনই ঢাকা থেকে বরিশালগামী একটি দূরপাল্লার দ্রুতগতির বাস তাকে সজোরে চাপা দিয়ে গতি না কমিয়েই পালিয়ে যায়। বাসের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান খোকন। ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ওসি মো. হেলালউদ্দিন জানান, চালক গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা যায়নি, তবে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাসটি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গোয়ালবাথান এলাকায় ভোর সাড়ে ৬টার দিকে ঘটে এক অদ্ভুত চেইন দুর্ঘটনা। একটি চলন্ত ট্রাকের পেছনে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা দেয় একটি মালবাহী পিকআপ ভ্যান। ঠিক তার পর মুহূর্তেই পেছন থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাস ওই পিকআপের পেছনে আবার ধাক্কা মারে।
দুই দিক থেকে আসা প্রচণ্ড চাপে পিকআপ ভ্যানটি কাগজের মতো দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে পিকআপের ভেতরে আটকে পড়ে চালক নাসির উদ্দিন (৪৫) ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং তার সহকারী গুরুতর আহত হন। নাওজোড় হাইওয়ে থানার ওসি সাউগাতুল আলম জানান, ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
কেন থামছে না এই চাকার নিচে মৃত্যুর মিছিল?
শনিবারের এই ১২টি মৃত্যু কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়। এর প্রতিটি নামের পেছনে জড়িয়ে আছে একটি করে পরিবার, তাদের এক আকাশ স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাসড়কগুলোতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, চালকদের ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা এবং গতির ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকাই এই ধরনের দুর্ঘটনার মূল কারণ।
বিশেষ করে আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কগুলোর মোড়ে বা জনবহুল এলাকায় গতিরোধক বা পর্যাপ্ত ট্রাফিক সাইন না থাকায় পথচারী ও ছোট যানবাহনগুলো প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে পড়ছে। আজকের এই পাঁচটি দুর্ঘটনাই প্রমাণ করে যে, আইন থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রয়োগ কতটা শিথিল। যদি এখনই মহাসড়কগুলোতে চালকদের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি জোরদার করা না যায়, তবে এই মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামানো সম্ভব হবে না। স্বজন হারানো মানুষদের এই বুক ফাটা আর্তনাদ আর কতদিন আমাদের সইতে হবে, সেই প্রশ্নই এখন দেশের সচেতন মহলে।

