দেশের বিদ্যমান ভঙ্গুর কর সক্ষমতা ও সনাতন অর্থনৈতিক কাঠামো দিয়ে আগামী অর্থবছরের বিশাল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নীতি-নির্ধারকদের মতে, আর্থিক খাতের আমূল ও বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এই বিশাল অঙ্কের বাজেট কীভাবে মাঠে বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন। সরকার কেবল ফাঁকা বুলি দিয়ে অর্থনীতি সচল রাখতে চাইছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিকেলে ময়মনসিংহের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত টাউন হল মোড়ের অ্যাডভোকেট তারেক স্মৃতি অডিটোরিয়ামে এক তপ্ত রাজনৈতিক সেমিনারে এই মন্তব্য করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের তরুণদের মনের কথা জানতে এই বিশেষ আলোচনার আয়োজন করা হয়েছিল।
‘তারুণ্যের বাজেট ভাবনা ও গণভোট বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এই সংবেদনশীল সেমিনারের মূল আয়োজক ছিল জাতীয় ছাত্র শক্তি ময়মনসিংহ জেলা শাখা। দুপুরের পর থেকেই ময়মনসিংহের বিভিন্ন প্রান্ত এবং প্রত্যন্ত উপজেলা থেকে ছাত্র ও তরুণ রাজনীতিকেরা অডিটোরিয়ামে এসে ভিড় জমান। ৫ আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এবারের বাজেট নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ ও প্রত্যাশা দুই-ই ছিল চোখে পড়ার মতো।
পুরোনো ফর্মুলা ও নতুন বাজেটের অসংগতি
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে জনগণের স্বাভাবিকভাবেই এক আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ছিল। মানুষ ভেবেছিল এই বাজেটে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বহুল কাঙ্ক্ষিত গণভোট এবং টেকসই কাঠামোগত পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রতিফলন থাকবে।
তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এখন পর্যন্ত সরকারের অর্থনৈতিক কোনো পরিকল্পনায় সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া দৃশ্যমান নয়। আসিফ মাহমুদ দেশের অর্থনীতির বর্তমান মৌলিক সংকটগুলোর কথা একে একে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশ এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে। কর্মসংস্থানে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে, বেসরকারি বিনিয়োগে খরা চলছে এবং রাজস্ব ঘাটতি প্রতি মাসেই রেকর্ড ছাড়াচ্ছে।
এই চার প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আসন্ন বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা বা কার্যকর ওষুধ দেখা যাচ্ছে না। এর বদলে সরকার সেই পুরোনো আমলের এনালগ ফর্মুলা নিয়ে ব্যস্ত। ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড কিংবা গ্রামীণ খাল খননের মতো সস্তা ও প্রথাগত কর্মসূচি নিয়েই সরকারের ভেতরে এবং বাইরে বেশি মাতামাতি ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে, যা সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়।
সংবিধান ও জেনারেশন জিরো টলারেন্স
সেমিনারে শুধু বাজেট বা অর্থনীতি নয়, দেশের চলমান সাংবিধানিক সংকট ও গণভোটের যৌক্তিকতা নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন সাবেক এই ছাত্রনেতা। পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “পুরোনো বন্দোবস্তের পচা গন্ধে যারা অভ্যস্ত, সেই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হয়তো আজ তরুণদের এই অগ্রযাত্রাকে টেনে ধরার চেষ্টা করবে। তারা ভাবছে আবার আগের নিয়মে ফিরে যাবে।”
আসিফ মাহমুদ তরুণদের মানসিকতা তুলে ধরে বলেন, দেশের পরবর্তী প্রজন্মের তরুণদের মনে বর্তমান বিদ্যমান সংবিধান নিয়ে আর কোনো ন্যুনতম সম্মান বা আবেগ অবশিষ্ট নেই। এটি অত্যন্ত নির্মম এক বাস্তব সত্য। তিনি বলেন, “সংবিধান নিয়ে যখন দেশের সাধারণ নাগরিক ও তরুণদের মধ্যে কোনো সম্মান থাকে না, তখন তা কেবল কিছু কাগজের বই ছাড়া আর কিছুই না। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হতে পারে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, এই অকার্যকর সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। জেনজি (Gen Z) এবং তাদের ঠিক পেছনেই জেন আলফারা (Gen Alpha) আসছে। এই নতুন দুই প্রজন্ম কোনো অন্যায় বা পুরোনো আপসকামিতা মেনে নেবে না। তারা এই পুরোনো জরাজীর্ণ ব্যবস্থাকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলবে এবং নিজেদের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ইনক্লুসিভ রাষ্ট্র-সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
মাঠের তরুণদের ক্ষোভ ও বাজেট দাবি
সেমিনারে অংশ নেওয়া ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ছাত্র শক্তির তৃণমূল নেতাকর্মীরাও বাজেট নিয়ে তাদের নিজস্ব মতামত ও ক্ষোভের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তারা বলেন, প্রতি বছর বাজেট আসে আর যায়, কিন্তু দেশের তরুণ সমাজের জন্য, বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো থোক বরাদ্দ থাকে না। শিক্ষা খাতের বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এখনো সর্বনিম্ন।
ছাত্রনেতারা দাবি করেন, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য বিশেষ ভাতা অথবা স্টার্ট-আপ ফান্ড গঠন করতে হবে, যাতে তরুণরা চাকরি খোঁজার বদলে নিজেরা উদ্যোক্তা হতে পারে। দেশের চালিকাশক্তি কৃষি খাতকে বাঁচাতে কৃষকদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার দাবিও আসে মাঠ থেকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ৫ আগস্টের পর দেশের তরুণ সমাজ রাষ্ট্র সংস্কারের যে এজেন্ডা হাতে নিয়েছিল, বাজেটে তার প্রতিফলন না থাকাটা বিপজ্জনক হতে পারে। আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্য মূলত সরকারের ধীরগতির আমলাতান্ত্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তরুণদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই এক প্রকাশ। কর সক্ষমতা না বাড়িয়ে কেবল ঋণের ওপর ভর করে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে দেশের সাধারণ মানুষের ওপরই শেষ পর্যন্ত করের বোঝা চাপবে।
ময়মনসিংহ টাউন হলের এই সেমিনার শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গিয়ে বাজেট ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে তরুণদের মতামত সংগ্রহ করবেন। সেই মতামতগুলো একত্র করে একটি ‘তারুণ্যের বাজেট ইশতেহার’ তৈরি করে সরকারের কাছে পেশ করা হবে। সরকার যদি সেই দাবি উপেক্ষা করে, তবে রাজপথে আবার নতুন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে শেষ হয় এই ছাত্র সমাবেশ।

