খাঁচার ভেতর বন্দি ছটফটে বাঘ কিংবা কংক্রিটের চার দেয়ালে ঝিমুতে থাকা সিংহ—চিড়িয়াখানার এই চেনা এবং কিছুটা নিষ্ঠুর দৃশ্যপট এবার হয়তো চিরতরে বদলে যেতে চলেছে। বন্যপ্রাণীদের তাদের চেনা প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে এবং দর্শনার্থীদের এক সম্পূর্ণ নতুন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা উপহার দিতে বড় উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। নতুন এই ভাবনায় চিড়িয়াখানার ভেতরের চেনা সমীকরণটি উল্টে যাবে। আর তা হলো—মানুষ থাকবে সুরক্ষিত সুড়ঙ্গ বা খাঁচার ভেতরে, আর পশুপাখিরা মনের আনন্দে ডানা মেলবে বা ঘুরে বেড়াবে উন্মুক্ত প্রান্তরে।
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বিনোদন কেন্দ্র রংপুর চিড়িয়াখানাকে এই আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক রূপ দিতেই এখন চলছে মহাপরিকল্পনা। ‘বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা ও রংপুর চিড়িয়াখানা আধুনিকায়ন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক একটি বড় প্রকল্প প্রস্তাবনা এখন সরকারের টেবিলে। এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ও মাঠ পর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিন খতিয়ে দেখতে আজ সরকারের এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল রংপুর সফর করেছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান এবং সরকারের অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞার নেতৃত্বে এই বিশেষ প্রতিনিধি দলটি রংপুর চিড়িয়াখানা পরিদর্শনে আসেন। এই আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিতে পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি এবং বন ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা চিড়িয়াখানার বর্তমান জরাজীর্ণ দশা এবং ভবিষ্যৎ রূপান্তরের নানা দিক খুঁটিয়ে দেখেন।
মাঠ পর্যায়ের সংকট ও সরেজমিন পরিদর্শন
দুপুরের কড়া রোদ মাথায় নিয়েই অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা এবং কমিটির সদস্যরা পুরো চিড়িয়াখানা এলাকা ঘুরে দেখেন। তারা একে একে বন্যপ্রাণীদের বিভিন্ন সেড বা খাঁচা, পরিচর্যা কেন্দ্র, পশুপাখিদের স্বাস্থ্যসেবার মান, তাদের দৈনিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সার্বিক নিরাপত্তা কাঠামো পরিদর্শন করেন। একই সঙ্গে দূর-দূরান্ত থেকে তীব্র গরম উপেক্ষা করে আসা সাধারণ দর্শনার্থীদের সঙ্গেও কথা বলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
দর্শনার্থীরা চিড়িয়াখানার বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাদের নানা অভিযোগ ও প্রত্যাশার কথা কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরেন। দীর্ঘদিন ধরে কোনো কোনো খাঁচা ফাঁকা পড়ে থাকা এবং নতুন কোনো আকর্ষণ না থাকায় স্থানীয় মানুষের মনে কিছুটা ক্ষোভও রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে চিড়িয়াখানার ভেতরের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে প্রতিনিধি দল সন্তোষ প্রকাশ করেন।
পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা চিড়িয়াখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতার প্রশংসা করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, বন্যপ্রাণীর কল্যাণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা এখন বিশ্বব্যাপী অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি দর্শনার্থীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পশুপাখিদের প্রতি আরও মানবিক ও যত্নশীল হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে কড়া নির্দেশ দেন।
নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময়
চিড়িয়াখানা পরিদর্শনের মূল পর্ব শেষে প্রতিনিধি দলটি রংপুর চিড়িয়াখানার কিউরেটরের কার্যালয়ে এক জরুরি মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সেখানে প্রকল্পের প্রশাসনিক ও কারিগরি বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে তাদের মূল্যবান মতামত দেন।
এই নীতিনির্ধারণী সভায় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্মপ্রধান (বন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উইং) মো. আল-আমিন সরকার এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিচালক ও উপসচিব পঙ্কজ ঘোষ। আরও উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা বিভাগের উপপ্রধান মোসা. জেসমিন আরা এবং কার্যক্রম বিভাগের সিনিয়র সহকারী প্রধান সামিরুল ইসলাম।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সভায় অংশ নেন মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. মো. আতিকুর রহমান, রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রমিজ আলম এবং বিশিষ্ট প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ডা. মুহ. নাজমুল হুদা। তারা প্রত্যেকেই রংপুর চিড়িয়াখানাকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার পক্ষে একমত পোষণ করেন।
আধুনিকায়নের নতুন রূপরেখা
সভা শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেন অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা। রংপুর চিড়িয়াখানার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “রংপুর চিড়িয়াখানা কেবল এই অঞ্চলের নয়, বরং পুরো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি বিনোদন কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন একটু স্বস্তির খোঁজে। তাই এখানে পশুপাখিদের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও প্রাকৃতিক আবহাওয়া নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব।”
তিনি আরও যোগ করেন, পশুপাখিদের সুস্থ রাখার পাশাপাশি মানুষের বিনোদনের মাত্রাকে আরও আধুনিক ও উন্নত করতে হবে। দর্শনার্থীরা যেন এখানে এসে আন্তর্জাতিক মানের সেবা পান, সেই লক্ষ্যেই সরকার এই আধুনিকায়ন প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে।
এই মেগা প্রকল্পের খুঁটিনাটি ও স্থানীয় চাহিদার বিষয়ে কথা বলেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন। তিনি জানান, রংপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেই মূলত এই চিড়িয়াখানাটি সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সেই প্রস্তাবের গুরুত্ব বিবেচনা করেই পরিকল্পনা কমিশনের এই উচ্চপর্যায়ের দল আজ সরেজমিন পরিদর্শনে এসেছেন।
শূন্য খাঁচা পূরণের তাগিদ
জেলা প্রশাসক মাঠ পর্যায়ের কিছু বাস্তব ও দুঃখজনক চিত্র সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আজ আমরা সরেজমিন ঘুরে যা দেখলাম, তা সত্যিই ভাবনার বিষয়। চিড়িয়াখানার জিরাফ সেডে কোনো জিরাফ নেই, উধাও হয়ে গেছে বিলুপ্তপ্রায় নীলগাই। জেব্রা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার কোনো সঙ্গী বা জোড়া নেই। একাকীত্বের কারণে এই প্রাণিগুলোও অবাদে ভুগছে।”
তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, প্রকল্পের কাজ শুরু হলে প্রথম কাজই হবে যে সমস্ত সেড বা খাঁচায় বর্তমানে কোনো প্রাণি নেই, সেখানে দ্রুত নতুন প্রাণি আনা। ঢাকার জাতীয় সাফারি পার্ক বা দেশের অন্যান্য সরকারি চিড়িয়াখানায় যেখানে অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত প্রাণি রয়েছে, সেখান থেকে প্রাণিগুলো রংপুরে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। এতে করে সরকারের অতিরিক্ত অর্থও সাশ্রয় হবে।
আধুনিকায়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরে রুহুল আমিন বলেন, নতুন এই মহাপরিকল্পনার আওতায় চিড়িয়াখানার ভেতরের পুরো যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হবে। নির্মাণ করা হবে দৃষ্টিনন্দন ও প্রশস্ত ওয়াকওয়ে বা রাস্তা। পশুপাখিদের চিকিৎসার জন্য থাকবে একটি আধুনিক কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশন সেন্টার, যেখানে অসুস্থ প্রাণীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া যাবে।
‘মানুষ থাকবে খাঁচায়, বাহিরে পশুপাখি’
তবে এই প্রকল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও যুগান্তকারী দিকটি হলো বন্যপ্রাণীদের উন্মুক্ত বিচরণের সুযোগ দেওয়া। জেলা প্রশাসক বলেন, “আমরা এমন একটি আধুনিক সেড ও বাউন্ডারি তৈরি করতে চাচ্ছি, যেখানে মানুষ থাকবে সুরক্ষিত খাঁচা বা কাঁচের সুড়ঙ্গের ভেতরে। আর পশুপাখিরা কোনো বন্দিত্ব ছাড়াই বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে বেড়াবে। এটি হবে উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।”
তিনি আরও জানান, দর্শনার্থীদের ধর্মীয় সুবিধার কথা চিন্তা করে চিড়িয়াখানা চত্বরে একটি দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও থাকবে বিশ্রামাগার, শৌচাগার এবং শিশু কর্নারসহ দর্শনার্থীবান্ধব নানা আধুনিক অবকাঠামো। সরকারের বর্তমান ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।
সময়সীমার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, সব ঠিক থাকলে এবং একনেকে প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন পেলে আগামী ৪ বছরের মধ্যে এই আধুনিকায়নের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে। সরকারের এই দূরদর্শী পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিলে রংপুর চিড়িয়াখানাটি কেবল উত্তরবঙ্গের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের অন্যতম সেরা এবং দৃষ্টিনন্দন পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হবে।
রংপুর চিড়িয়াখানার ইতিহাস ও বর্তমান চিত্র
ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে রংপুর চিড়িয়াখানার একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে দুটি মাত্র বড় চিড়িয়াখানা রয়েছে, তার মধ্যে ঢাকার মিরপুরের পরেই রংপুরের অবস্থান। দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে এই চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৮৯ সালে রংপুর মহানগরীর হনুমানতলা এলাকায় প্রায় ২২ একর বিশাল জমির ওপর এই চিড়িয়াখানাটি গড়ে তোলা হয়। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ১৯৯২ সালে এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটসহ পুরো উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রধান বিনোদনের খোরাক জুগিয়ে আসছে।
বর্তমানে এই বিশাল চিড়িয়াখানাটিতে ৩১টি ভিন্ন প্রজাতির মোট ২৪৯টি দেশি-বিদেশি বন্যপ্রাণি ও পাখি রয়েছে। যার মধ্যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, আফ্রিকান সিংহ, বিশাল জলহস্তী, চিত্রা হরিণ, মায়াবী অজগর সাপ, ইমু পাখি, উটপাখি, রঙিন ময়ূর, চঞ্চল বানর, হনুমান, বিরল প্রজাতির কেশওয়ারি, গাধা ও তিড়িংবিড়িং করা ঘোড়া অন্যতম।
তবে দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের কোনো সংস্কার কাজ না হওয়ায় এবং নতুন কোনো বন্যপ্রাণী যুক্ত না হওয়ায় চিড়িয়াখানাটি তার পুরনো গৌরব ও জৌলুস হারাতে বসেছিল। খাঁচাগুলোর জং ধরা দশা এবং বন্যপ্রাণীদের অপুষ্টির অভিযোগও মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে আসত।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকারের এই ১শত ৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রংপুর চিড়িয়াখানার মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিনোদন কেন্দ্রকে যদি সত্যিই ‘সাফারি পার্ক’ স্টাইলে আধুনিকায়ন করা যায়, তবে তা এই অঞ্চলের অর্থনীতি এবং পর্যটন খাতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। এখন দেখার বিষয়, পরিকল্পনা কমিশনের এই পরিদর্শনের পর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে কত দ্রুত এই ফাইল আলোর মুখ দেখে।

