কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে নির্মমভাবে খুন হওয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। বহুল আলোচিত এই মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
আজ বুধবার (২০ মে) দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এজলাসে বসে এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে অপর চার আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
এই রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই কক্সবাজার আদালত পাড়া ও এর আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ও কৌতূহল বিরাজ করছিল। রায় ঘোষণার পরপরই আদালত চত্বর ও মূল ভবন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাবের সদস্য মোতায়েন করা হয়। রায়ের পর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের একে একে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে কঠোর পাহারায় প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। পরে বিশেষ সুরক্ষায় তাদের কক্সবাজার জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম চৌধুরী রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘ শুনানি, বহু মানুষের সাক্ষ্যগ্রহণ এবং জব্দকৃত আলামত নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা শেষে বিজ্ঞ আদালত এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন।
অতিরিক্ত পিপি আরও জানান, মূল হত্যা মামলার পাশাপাশি একই ঘটনায় দায়ের হওয়া সংশ্লিষ্ট অস্ত্র মামলাটিতেও কয়েকজন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সব মিলিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই রায় একটি বড় নজির হয়ে থাকবে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় মোট ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। আজ রায় ঘোষণার সময় ১৮ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। বাকিরা পলাতক রয়েছেন।
তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও অন্যান্য দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বা পারিবারিক পরিচয় বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি হাতে পেলে কার কী সাজা হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে। চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় একটি বড় ডাকাত দল হানা দেয়। খবর পেয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি টহল দল দ্রুত সেখানে অভিযানে যায়।
সে সময় তরতাজা ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন ডাকাতদের ধরতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। কিন্তু অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ডাকাত দলের সদস্যরা তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং ধারালো ছুরি দিয়ে তার শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করে।
গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ লেফটেন্যান্ট। কর্তব্যরত অবস্থায় একজন সেনা কর্মকর্তা ডাকাতদের ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার এই ঘটনাটি সে সময় পুরো দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ এবং আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ২৫ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে চকরিয়া থানায় একটি মামলা করেন। ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে ডাকাতির প্রস্তুতি ও হত্যার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়।
একই ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া অবৈধ অস্ত্রের সূত্র ধরে চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে আরও একটি পৃথক মামলা করেন। পরে এই দুটি মামলারই তদন্তভার পান চকরিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরী।
দীর্ঘ ও নিখুঁত তদন্ত শেষে পুলিশ এজাহারভুক্ত এবং তদন্তে প্রাপ্ত নতুন আসামিসহ মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। তদন্তে প্রাথমিক এজাহারভুক্ত কয়েকজনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়।
আদালতে জমা দেওয়া সেই অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের তালিকায় ছিলেন—জালাল উদ্দিন ওরফে বাবুল, হেলাল উদ্দিন, মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, আনোয়ার হাকিম, জিয়াবুল করিম, ইসমাইল হোসেন, নুরুল আমিন, নাছির উদ্দিন, আব্দুল করিম ও মোহাম্মদ সাদেক।
অভিযোগপত্রে আরও নাম ছিল—আনোয়ারুল ইসলাম, মোরশেদ আলম, শাহ আলম, আবু হানিফ, এনামুল হক ওরফে তোতলা এনাম, মো. এনাম, কামাল ওরফে ভেন্ডি কামাল ও মিনহাজ উদ্দিনের। এদের মধ্যে কয়েকজন আজ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রায় শোনেন।
এদিকে, রায় ঘোষণার পর নিহত সেনা কর্মকর্তা তানজিম সারোয়ার নির্জনের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তার পরিবারের সদস্যরা এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা চান, উচ্চ আদালতেও যেন এই রায় বহাল থাকে এবং দ্রুত কার্যকর করা হয়।
অন্যদিকে, রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তারা দাবি করেছেন, তাদের মক্কেলরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা খুব শীঘ্রই উচ্চ আদালতে (হাইকোর্টে) আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
নিহত লেফটেন্যান্ট তানজিমের অকাল মৃত্যু বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। তিনি ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) থেকে ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে আর্মি সার্ভিস কোরে (এএসসি) কমিশন লাভ করেছিলেন।
দেশসেবার ব্রত নিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এই তরুণ অফিসারের জীবন এভাবে চোর-ডাকাতদের হাতে প্রদীপ নেভার মতো নিভে যাবে, তা কেউ মেনে নিতে পারেনি। আজকের রায়ের মাধ্যমে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্বরোচিত ঘটনার আংশিক আইনি বিচার সম্পন্ন হলো।

