একটি মোবাইল কল বদলে দিল একটি পরিবারের ভাগ্য। দুপুরের চেনা রোদ তখন শীতলক্ষ্যা নদীর জলে খেলা করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে নদীর পাড়ে ডেকে নিয়ে এক ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় এই ঘটনা ঘটেছে।
নিহত ব্যবসায়ীর নাম মাকসুর রহমান জুয়েল। তার বয়স হয়েছিল ৪৫ বছর। তিনি শান্তিনগর এলাকার মৃত তাজুল ইসলামের ছেলে। স্থানীয়ভাবে তিনি ড্রেজার ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন। আধিপত্য বিস্তার ও ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুরে উপজেলার মদনগঞ্জের শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। ভরদুপুরে এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরের দিকে জুয়েল বাড়িতেই ছিলেন। হঠাৎ তার মুঠোফোনে একটি কল আসে। তার বন্ধু শ্যামল তাকে মোবাইল ফোনে ডেকে নেন। শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে তাকে আসতে বলা হয়েছিল।
বন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে জুয়েল দ্বিধা করেননি। তিনি সরল বিশ্বাসে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক দল ঘাতক। আগে থেকে ওত পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র নিয়ে আচমকা জুয়েলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
হামলাকারীরা জুয়েলকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়।
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর অপরাধীরা দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। নদীর পাড়ে রক্তাত্ব মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেন। দুপুরের এই ঘটনায় নদীর পাড়ের বাসিন্দারা স্তব্ধ হয়ে গেছেন। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে জুয়েলের মৃত্যুর খবর।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। জুয়েলের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। তাদের আহাজারিতে শান্তিনগর এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। স্বজনদের দাবি, এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় ড্রেজার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় একটি চক্রের সাথে জুয়েলের বিরোধ চলছিল। এর পাশাপাশি ওই এলাকায় মাদক ব্যবসার একচ্ছত্র বিস্তারের চেষ্টাও করছিল কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। জুয়েল এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়া এবং ড্রেজার ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার কারণেই জুয়েলকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। তারা বলছেন, জুয়েলকে বাঁচতে দেওয়া হয়নি কারণ তিনি অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
নিহতের ভাই সোহেল আজ বিকেলে সাংবাদিকদের কাছে সরাসরি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় টিটু, আল আমিন, ডিশ দুলাল ও পলাশের সঙ্গে জুয়েলের ব্যবসা ও এলাকার আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল।
সোহেল অভিযোগ করে বলেন, “আমার ভাই এলাকায় কোনো অন্যায় সহ্য করতেন না। বিশেষ করে মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে তিনি সবসময় কথা বলতেন। এই মাদক ব্যবসায়ীরাই আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে বন্ধুকে দিয়ে ফোন করিয়ে ডেকে নিয়ে গেছে। তারপর ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “শ্যামল নামের যে বন্ধু আমার ভাইকে ফোন করেছিল, সেও এই ষড়যন্ত্রের অংশ। আমরা এই ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেকের ফাঁসি চাই। আমার ভাইয়ের মতো একজন সৎ ব্যবসায়ীকে এভাবে মরে যেতে হতে পারে না।”
বন্দর থানা পুলিশ জানিয়েছে, দুপুরের পর তারা শান্তিনগর এলাকা থেকে লাশ উদ্ধার করে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় মরদেহের বিভিন্ন জায়গায় গভীর কাটার দাগ পাওয়া গেছে। আঘাতগুলো এতটাই মারাত্মক ছিল যে জুয়েলের বাঁচার কোনো সুযোগ ছিল না।
বন্দর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “খবর পাওয়ার পরপরই আমাদের পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। আমরা মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছি।”
ওসি আরও জানান, ঘটনার পর থেকেই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরাধীদের ধরতে ইতিমধ্যেই পুলিশের একাধিক দল মাঠে নেমেছে। সন্দেহভাজনদের বাড়ি ও সম্ভাব্য আস্তানায় অভিযান চালানো হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ড্রেজার ব্যবসা এবং নদীর পাড়ের বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বন্দর এলাকায় প্রায়শই ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জুয়েল হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যেও এই বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন এবং অবৈধ প্রভাব খাটাানোর বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের এই নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ড্রেজার ব্যবসার আড়ালে অপরাধ সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ড্রেজার বসিয়ে নদী থেকে বালু তোলার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালীরা প্রায়শই পেশাদার খুনিদের ব্যবহার করে থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শান্তিনগর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, “দুপুরের দিকে আমরা নদীর পাড় থেকে চিৎকার শুনতে পাই। গিয়ে দেখি জুয়েল ভাই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। এই এলাকায় এখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। আমরা আতঙ্কে আছি।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টিটু এবং আল আমিনের দলের বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি এবং মাদক বিক্রির একাধিক অভিযোগ রয়েছে। জুয়েল তাদের এই কর্মকাণ্ডের প্রধান বাধা ছিলেন। ড্রেজার ব্যবসার লভ্যাংশের একটি অংশ নিয়েও তাদের মধ্যে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকাশ্যে দিবালোকে এমন হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে অপরাধীদের মনে আইনের কোনো ভয় নেই। বন্ধুকে দিয়ে ডেকে নিয়ে খুন করার এই কৌশলটি অত্যন্ত চতুর। এই মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড (সিডিআর) যাচাই করা জরুরি।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে মোবাইল থেকে জুয়েলকে কল করা হয়েছিল, সেই নম্বরটি এবং তার বন্ধু শ্যামলের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। ঘটনার পর থেকেই শ্যামল এলাকা থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তার ফোনটিও বর্তমানে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গের সামনে বিকেলে জুয়েলের আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ভিড় জমতে দেখা যায়। ড্রেজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের দাবি তুলেছেন।
সমিতির এক নেতা বলেন, “আমরা বন্দর এলাকায় ব্যবসা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন হই। জুয়েল হত্যার বিচার যদি দ্রুত না হয়, তবে আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব। ব্যবসায়ীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।”
বিকেলের দিকে শান্তিনগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শীতলক্ষ্যার পাড় এখন থমথমে। যে স্থানটিতে জুয়েলকে কোপানো হয়েছিল, সেখানে এখনো রক্তের দাগ লেগে রয়েছে। কৌতূহলী মানুষ দূর থেকে জায়গাটি দেখছেন। অধিকাংশ দোকানপাট আংশিক বন্ধ রাখা হয়েছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আজ সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা নিহতের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন এবং সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন। অপরাধীরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জের এই বন্দর অঞ্চলটি ক্রাইম জোন হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। গত কয়েক মাসে এখানে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। মাদক ও আধিপত্য বিস্তারের এই চক্রটিকে গোড়া থেকে উপড়ে না ফেললে এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আরও ঘটবে বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
পৌর এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূল হোতা কারা, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। কেবল মাঠ পর্যায়ের খুনিদের ধরলে হবে না, যারা পেছন থেকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে এই সিন্ডিকেট চালায়, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
আজ রাতে জুয়েলের পরিবারের পক্ষ থেকে বন্দর থানায় একটি আনুষ্ঠানিক হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। মামলায় টিটু, আল আমিন, ডিশ দুলাল, পলাশ এবং বন্ধু শ্যামলসহ বেশ কয়েকজনকে নামধারী এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, ময়নাতদন্ত আগামীকাল সকালে সম্পন্ন হতে পারে। লাশের শরীরে ধারালো অস্ত্রের অন্তত সাত থেকে আটটি গভীর ক্ষত রয়েছে। মাথার আঘাতটিই মূলত মৃত্যুর প্রধান কারণ হতে পারে।
জুয়েলের মৃত্যুতে তার দুটি সন্তান ও স্ত্রী এখন অথৈ সাগরে পড়েছেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি স্তব্ধ। নিহতের মা ছেলের শার্ট ধরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। পুরো উজ্জ্বলপাড়া এলাকায় এখন কেবলই শোকের ছায়া।
পুলিশ প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে, রাতের মধ্যেই কিছু অগ্রগতির খবর পাওয়া যেতে পারে। জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এই মামলার ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। নদীর পাড়ের সিসিটিভি ফুটেজগুলোও সংগ্রহের চেষ্টা করছে পুলিশ।
শীতলক্ষ্যার পাড়ে বয়ে যাওয়া হাওয়া এখন যেন এক বিষাদের গল্প বলছে। সামান্য ব্যবসা আর ক্ষমতার লোভে কীভাবে একটি জীবন প্রদীপ নিভে গেল, সেই প্রশ্নই এখন সবার মুখে মুখে। নারায়ণগঞ্জবাসী এখন তাকিয়ে আছেন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

