একটি পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের চেনা পড়ার টেবিল। সেখানে নিয়ম করে আসতেন এক গৃহশিক্ষিকা। কিন্তু সেই পড়ার ঘরই যে শেষ পর্যন্ত এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হবে, তা কেউ ভাবেনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের এক বাড়ি থেকে নিখোঁজের পরদিন এক গৃহশিক্ষিকার বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে শহরের অধিরল্যাংড়ার মোড়-চৌকাপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহত শিক্ষিকার নাম মরিয়ম বেগম। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার উজ্জ্বলপাড়ার বাসিন্দা মোসাদ্দেক হোসেনের স্ত্রী বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
এই নৃশংস ঘটনার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি বস্তাভর্তি লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই ছাত্রীর বাবা-মাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মরিয়ম বেগম স্থানীয় বাসিন্দা সুমি খাতুনের মেয়ে মিথীলাকে নিয়মিত প্রাইভেট পড়াতেন। মিথীলা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। প্রতিদিনের মতো গতকাল সোমবার বিকালেও মরিয়ম ওই বাড়িতে পড়াতে গিয়েছিলেন।
কিন্তু পড়া শেষ হওয়ার স্বাভাবিক সময় পার হয়ে গেলেও তিনি আর বাড়ি ফিরে আসেননি। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও মায়ের কোনো খোঁজ না পেয়ে সন্তানদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও মরিয়মের কোনো সন্ধান মেলেনি।
মায়ের আকস্মিক এই নিখোঁজের ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েন সন্তানেরা। কোনো উপায় না দেখে সোমবার রাতেই মরিয়ম বেগমের এক ছেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পুলিশ তখন থেকেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করে।
আজ মঙ্গলবার সকালে সরকারের জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ একটি ফোন আসে। ফোনের ওপাশ থেকে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সদর থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা ওই ছাত্রীর বাড়ি তল্লাশি করতে শুরু করে।
তল্লাশির একপর্যায়ে ঘর থেকে একটি সন্দেহভাজন বস্তা উদ্ধার করা হয়। বস্তার মুখ খুলতেই বেরিয়ে আসে নিখোঁজ মরিয়ম বেগমের নিথর দেহ। পুলিশের উপস্থিতিতে ঘরের ভেতর তখন এক বীভৎস দৃশ্যের অবতারণা হয়।
লাশ উদ্ধারের সময় সুরতহাল প্রতিবেদনে মরিয়মের শরীরে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা গেছে। পুলিশ জানায়, নিহতের মাথায় এবং ঠোঁটে গভীর আঘাতের দাগ রয়েছে। রক্ত জমাট বেঁধে থাকা সেই ক্ষতগুলো দেখে ধারণা করা হচ্ছে, তাকে ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ক্লু মিলেছে নিহতের কানে। মরিয়মের কানের দুল দুটি ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। কান থেকে সোনা জোরপূর্বক টেনে ছিঁড়ে নেওয়ার কারণে সেখানেও ক্ষত তৈরি হয়েছে। এই আলামত দেখেই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে ধারণা পায় পুলিশ।
ঘটনার পরপরই পুলিশ ওই বাড়ির মালিক রুবেল ও তার স্ত্রী সুমি খাতুনকে আটক করে। প্রতিবেশীদের তোপের মুখ থেকে তাদের উদ্ধার করে দ্রুত থানা হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই দম্পতিই মরিয়মকে হত্যার পর লাশ গুমের চেষ্টা করছিল বলে অভিযোগ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের টিম লাশ উদ্ধার করে। সন্দেহভাজন হিসেবে রুবেল ও সুমি নামের এক দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।”
প্রাথমিক তদন্ত ও আটকদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের কথা উল্লেখ করে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। মরিয়মের কানের স্বর্ণের দুল হাতিয়ে নেওয়ার লোভেই তাকে শ্বাসরোধ ও আঘাত করে মারা হয়েছে।
কান্নার জেরে কথা বলতে পারছিলেন না নিহতের বড় ছেলে মারুফ আহমেদ। মায়ের এই আকস্মিক মৃত্যু তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। তিনি বলেন, “আমার আম্মা প্রতিদিনের মতো ওই বাচ্চার পড়াশোনা নিশ্চিত করতেই সেখানে গিয়েছিলেন। তাদের সাথে আমাদের কোনো শত্রুতা ছিল না।”
মারুফ আরও বলেন, “ওরা মানুষ নয়, পিশাচ। কেবল মাত্র সামান্য কিছু স্বর্ণের কানের দুলের লোভে ওরা আমার মাকে এভাবে নির্মমভাবে খুন করল? আমি এই খুনিদের সর্বোচ্চ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যেন আর কোনো সন্তানকে এভাবে মা হারাতে না হয়।”
এদিকে সুমি খাতুনকে আটকের পর স্থানীয় বাসিন্দারা তার বিরুদ্ধে নানা বিস্ফোরক তথ্য দিতে শুরু করেছেন। প্রতিবেশীদের দাবি, সুমির অপরাধের ইতিহাস এটাই প্রথম নয়। এর আগেও তার বিরুদ্ধে এলাকায় একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছিল।
স্থানীয়রা জানান, সুমি খাতুন এর আগে এলাকার কয়েকজন নারীকে কৌশলে নিজের বাড়িতে ডেকে আনতেন। তারপর জুস বা অন্য কোনো পানীয়ের সাথে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে তাদের অজ্ঞান করতেন। নারীরা অচেতন হয়ে পড়লে তাদের শরীর থেকে সোনা ও টাকা ছিনতাই করতেন তিনি।
চৌকাপাড়া এলাকার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সুমির এই চুরির অভ্যাসের কথা আমরা অনেকেই জানতাম। কিন্তু সে যে কানের দুলের জন্য একজন মানুষকে এভাবে খুন করে বস্তায় ভরে রাখবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। আমরা এই দম্পতির ফাঁসি চাই।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পূর্বের ঘটনাগুলোতে সুমির বিরুদ্ধে কঠোর কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই তার সাহস দিন দিন বেড়েছে। যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আজ একজন নিরীহ গৃহশিক্ষিকাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য চকাতে হলো।
পুলিশ জানিয়েছে, লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং মৃত্যুর সঠিক সময় সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
হত্যাকাণ্ডের সময় ওই বাড়িতে অন্য কেউ উপস্থিত ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। বিশেষ করে সুমি ও রুবেলের পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে মিথীলা ঘটনার সময় কোথায় ছিল এবং সে কিছু দেখেছে কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে।
আইনজীবীরা বলছেন, এটি একটি জঘন্যতম অপরাধ। শিক্ষকের মতো সম্মানীয় একজন মানুষকে ছাত্রীর নিজের বাড়িতে ডেকে এনে হত্যা করা সামাজিক অবক্ষয়ের চরম রূপ। দ্রুততম সময়ে এই মামলার চার্জশিট গঠন করে বিচার কাজ শুরু করা উচিত।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার পরিদর্শক জানান, এই ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আটক দম্পতিকে আগামীকাল আদালতে সোপর্দ করে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে।
সাধারণত প্রত্যন্ত এলাকায় এই ধরনের অপরাধের ঘটনায় নারীদের টার্গেট করা হয় বেশি। গহনা বা সামান্য কিছু টাকার জন্য একা পেয়ে নারীদের ওপর আক্রমণ করার প্রবণতা ইদানীং বাড়ছে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
পৌর এলাকার উজ্জ্বলপাড়ায় মরিয়ম বেগমের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। প্রতিবেশীরা দলে দলে আসছেন শোকসন্তপ্ত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে। এলাকায় মরিয়ম একজন শান্ত ও ধার্মিক নারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যিনি টিউশনি করে সংসারে কিছুটা অবদান রাখতেন।
দুপুরের দিকে মরিয়মের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে নিয়ে যাওয়ার সময় হাসপাতালের সামনে ভিড় করেন উৎসুক মানুষ। সবার মুখেই ছিল এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের নিন্দা। সাধারণ মানুষ দাবি তুলেছেন, অপরাধীদের যেন কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে ছাড় দেওয়া না হয়।
শহরের সাধারণ গৃহশিক্ষক ও গৃহশিক্ষিকাদের মধ্যেও এই ঘটনার পর এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অন্যের বাড়িতে গিয়ে নিরাপদে শিক্ষা দেওয়ার পরিবেশ নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলছেন। অনেকেই বলছেন, পরিচিত পরিবারগুলোর আচরণও এখন আর বিশ্বাসযোগ্য থাকছে না।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, “আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে আদালতের মুখোমুখি করা হবে। আমরা মামলার সব দিক খুব নিখুঁতভাবে তদন্ত করছি।”
বিকেলের দিকে অধিরল্যাংড়ার মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অভিযুক্ত সুমি ও রুবেলের বাড়িটি এখন জনশূন্য। বাড়ির প্রধান ফটকে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে। উৎসুক জনতা দূর থেকে বাড়িটির দিকে তাকিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বাড়িটি থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করেছেন, যা আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। কানের দুল দুটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা তদন্তের স্বার্থে এখনই খোলসা করেনি পুলিশ প্রশাসন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, সামান্য বস্তুগত লোভ কীভাবে মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দিতে পারে। একটি পরিবার তাদের অভিভাবককে হারাল, আর একটি শিশু সারাজীবনের জন্য দেখল তার নিজের বাবা-মার অপরাধের অন্ধকার চেহারা।
আপাতত পুরো শহর জুড়ে এই একটাই আলোচনা—একটি সোনার কানের দুল কীভাবে কেড়ে নিল একটি তাজা প্রাণ। পুলিশ প্রশাসন দ্রুততম সময়ে এই মামলার তদন্ত শেষ করে অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে, এমনটাই প্রত্যাশা নিহতের পরিবার ও সচেতন নাগরিক সমাজের।

