সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হঠাৎ ছোঁড়া গুলির জবাবে তাৎক্ষণিক পাল্টা গুলি চালিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
গতকাল সোমবার বিকেলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। বিজিবির সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) আওতাধীন এলাকায় এই মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেখানে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) বিজিবির সদর দফতর থেকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবির এই দ্রুত ও কঠোর অবস্থানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিবৃতিতে বলা হয়, সোমবার বিকেলে সোনারহাট সীমান্ত এলাকায় টহল দেওয়ার সময় হঠাৎ বিএসএফ সদস্যরা উসকানিমূলকভাবে গুলি ছোঁড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবিও পাল্টা ফায়ার শুরু করে।
সীমান্তের মাঠে থাকা সাধারণ মানুষের বয়ানে জানা যায়, গুলির শব্দে পুরো এলাকায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মাঠের কৃষকেরা কাজ ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে শুরু করেন।
বিজিবির জোরালো ও পেশাদার পদক্ষেপের কারণে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। ফলে পরিস্থিতি বড় কোনো সংঘাতের দিকে মোড় নেয়নি এবং দ্রুতই তা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এখন পর্যন্ত এই গোলাগুলির ঘটনায় দুই পক্ষের কোনো সদস্য বা সাধারণ নাগরিকের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আকস্মিক এই ঘটনায় সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ঘটনার পরপরই সোনারহাট সীমান্ত এলাকায় বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নজরদারি এবং টহল আগের চেয়ে দ্বিগুণ জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, সীমান্তে যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিহত করতে তারা এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নীতি অবলম্বন করছে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীটি।
বাহিনীর পক্ষ থেকে এক বার্তায় বলা হয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষা করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেকোনো পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে বিজিবি।
একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সীমান্তবর্তী জনসাধারণের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে বিজিবি প্রশাসন। কাউকেই যেন অননুমোদিতভাবে সীমান্ত অতিক্রম বা কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে না দেওয়া হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সবাইকে সীমান্তের কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
বর্তমানে সোনারহাট সীমান্তের পরিস্থিতি শান্ত ও পুরোপুরি স্থিতিশীল রয়েছে বলে দাবি করেছে বিজিবি। তবে ওপারে বিএসএফের নড়াচড়ার ওপর সার্বক্ষণিক কড়া নজর রাখছেন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা।
এই ঘটনার পর দুই দেশের সীমান্ত কমান্ডার পর্যায়ে কোনো পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সাধারণত এমন পরিস্থিতির পর আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়।
ভৌগোলিক কারণে সিলেটের এই সীমান্ত এলাকাটি বরাবরই বেশ সংবেদনশীল। এর আগেও বিভিন্ন সময় এই অঞ্চলে ছোটখাটো উত্তেজনা দেখা দিলেও এবার বিজিবির কড়া জবাব স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, তারা সীমান্তের সাধারণ মানুষের সুরক্ষার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোনারহাট এলাকার স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, দুপুরের পর হঠাৎ করেই ওপার থেকে গুলির শব্দ আসে। বিজিবি ভাইদের সময়োচিত জবাবের কারণে বড় কোনো বিপদ হয়নি, তারা শক্তভাবে দাঁড়িয়েছেন।
সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে দুই দেশেরই দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। উসকানিমূলক গুলি ছোঁড়ার মতো ঘটনা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আপাতত থমথমে ভাব কেটে গেলেও পুরো সোনারহাট এলাকায় বিজিবির কঠোর অবস্থান চোখে পড়ার মতো। সীমান্তের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল দলগুলো দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।

