গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) ক্যাম্পাস এখন থমথমে। নতুন উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রোববার সকাল থেকে সেখানে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতদের হামলার পর পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে উত্তেজনার পারদ কেবলই চড়েছে। দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া আর ইটপাটকেল নিক্ষেপে রক্তাক্ত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে এখন থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
ঘটনার সূত্রপাত রোববার সকাল দশটার দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন একদল শিক্ষার্থী। তাদের দাবি ছিল একটাই—প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই কাউকে উপাচার্য করতে হবে। কিন্তু হঠাৎ করেই সেখানে দৃশ্যপটে হাজির হয় একদল বহিরাগত যুবক।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বহিরাগতরা নতুন উপাচার্যের পক্ষে স্লোগান দিতে দিতে ক্যাম্পাসের দিকে এগোয়। একপর্যায়ে তারা সরাসরি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়। শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি, যা মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে গাজীপুর জেলা পুলিশের একাধিক টিম। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কয়েকটি ইউনিটকে তলব করা হয়। তারা দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়।
গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই ক্যাম্পাসে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, বৃহস্পতিবার রাতেই শিক্ষার্থীরা এই নিয়োগের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। শুক্র ও শনিবার ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল।
তবে রবিবারের সকালটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে শিক্ষার্থীরা আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকে। ঠিক তখনই নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যের সমর্থক দাবি করে কিছু বহিরাগত লোক এসে শিক্ষার্থীদের হঠানোর চেষ্টা করে।
সংঘর্ষের সময় পুরো ক্যাম্পাস এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা দিকবিদিক ছুটোছুটি করতে থাকেন। আশপাশের দোকানপাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তার ওপর ইটের টুকরো আর লাঠিসোঁটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তাদের মতে, ডুয়েট দেশের অন্যতম একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামো সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অনেকটাই আলাদা ও জটিল।
শিক্ষার্থীদের এক প্রতিনিধি জানান, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের বাস্তবতা বাইরের কেউ এসে বুঝবেন না। এখানকার প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য একজন প্রকৌশল ব্যাকগ্রাউন্ডের অভিজ্ঞ শিক্ষক প্রয়োজন। বহিরাগত কাউকে আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না।”
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের পেছনে শিক্ষকদের একটি বড় অংশের পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে। ডুয়েটের শিক্ষক প্রতিনিধিরাও চান, এই প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই যোগ্য এবং জ্যেষ্ঠ কোনো শিক্ষককে এই শীর্ষ পদে আসীন করা হোক।
এদিকে, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, “নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর থেকেই ডুয়েটে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছিল। আমরা বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আজ সকালে সেই উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।”
তিনি আরও জানান, ক্যাম্পাস এবং এর আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের নতুন সহিংসতা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিস্থিতি এখন পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে পুলিশের এই দাবির পরও শিক্ষার্থীদের মনে ক্ষোভ ও আতঙ্ক কাটেনি। বহিরাগতরা কীভাবে ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে এসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর সাহস পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা এই হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পুরো প্রশাসনিক ভবন এখন এক প্রকার অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে।
আহত শিক্ষার্থীদের সহপাঠীরা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকজনের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক। তাদের মাথায় ও শরীরে ইটের আঘাত লেগেছে। স্থানীয় সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও কিছু শিক্ষার্থীকে বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
এই সংঘর্ষের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। আজ কোনো ক্লাস বা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। অনেক শিক্ষার্থী হল ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
বিকেলের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও থমথমে ভাব কাটেনি। প্রধান ফটকের সামনে সাজোয়া যান নিয়ে অবস্থান করছে পুলিশ। বহিরাগতদের হটিয়ে দেওয়া হলেও তারা আশপাশের গলিতে ওত পেতে আছে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা।
ডুয়েটের এই চলমান সংকট কীভাবে নিরসন হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। শিক্ষার্থীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন থেকে পিছু হটবেন না। প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচির ডাক দেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলো। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন না হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

