রাজনীতির মাঠে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে ব্যাহত করতে রাজনীতির নামে কোনো ধরনের অরাজকতা সহ্য করা হবে না।
শনিবার সন্ধ্যায় চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি এ সব কথা বলেন। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে স্থানীয় দুস্থ ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ উপলক্ষে এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দীর্ঘ দিন পর চাঁদপুরের মাটিতে সরকার প্রধানের এই বক্তব্য শুনতে দুপুর থেকেই মাঠ জুড়ে মানুষের ঢল নামে।
জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “রাজনীতির নামে যদি কেউ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চায়, রাজনীতির নামে যদি কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে আমরা কেউ বসে থাকবো না।” তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশের মানুষ শান্তিতে বিশ্বাসী এবং সরকার জনগণের সেই শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ২০ blankets বছরের রাজনৈতিক স্থবিরতার পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে দেশের মানুষ এক নতুন প্রত্যাশা নিয়ে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রায় দিয়েছে। দেশের মানুষ বিএনপির পক্ষে যে রায় দিয়েছে, তার মূল ভিত্তিই ছিল নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো। সরকার এখন জনগণের সেই আস্থা ও বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায় কাজ করছে।
নিজের রাজনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি রাজনীতি মানে খাল খনন, কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করা। আমি ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি রাজনীতি মানে নতুন নতুন মিল-কলকারখানা তৈরি করা এবং বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।”
তিনি আরও যোগ করেন, রাজনীতি কোনো ভোগবিলাসের জায়গা নয়। রাজনীতি মানে হলো মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যের সঠিক ব্যবস্থা করা এবং সর্বস্তরের মানুষের নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটিই বর্তমান সরকারের মূল রাজনৈতিক আদর্শ এবং এই নীতিকে ধারণ করেই দেশ পরিচালনার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময়কার স্মৃতি চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রামগঞ্জে ঘুরেছেন, তখন মা-বোনদের একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দেশে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি পরিবার রয়েছে। সরকার গঠন করতে পারলে প্রতিটি প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া পরিবারের মায়েদের কাছে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি।
আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং জনগণের সমর্থনে সরকার গঠনের মাত্র এক মাসের মধ্যেই এই বিশাল ও জনকল্যাণমুখী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই কার্ডের মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষেরা সরাসরি উপকৃত হবেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
তবে দেশের বিশাল জনসংখ্যার কারণে এখনো অনেকেই এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেননি বলে স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রী। এর পেছনে একটি বড় প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কারণও ব্যাখ্যা করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার যে আর্থিক কাঠামোর মধ্যে কাজ শুরু করেছে, সেই চলতি বাজেটটি এই সরকারের তৈরি করা নয়।
তিনি বলেন, “আমরা যে বাজেট থেকে এই কাজগুলো শুরু করেছি, সেই বাজেটটি অন্য একটি সরকারের তৈরি করা। স্বাভাবিকভাবেই তাদের আগের বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য এই ধরনের ফ্যামিলি কার্ডের কোনো বিশেষ বরাদ্দ ছিল না।” তবে এই সীমাবদ্ধতা সাময়িক বলে তিনি উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করেন।
দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে আগামী জুন মাসে জাতীয় সংসদে নতুন অর্থ বছরের বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, আগামী মাসে সংসদে নতুন বাজেট পাস হওয়ার সাথে সাথে দেশব্যাপী আরও বিপুল সংখ্যক মায়ের কাছে এই ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। বাজেটে এর জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী চার থেকে সাড়ে চার বছরের মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি যোগ্য ও গ্রামীণ পরিবারের কাছে যাতে এই ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে যায়, প্রশাসন সেই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে। এর ফলে দেশের একটি পরিবারও এই সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের বাইরে থাকবে না।
অনুষ্ঠানে নারী শিক্ষার প্রসারে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার শাসন আমলের কথা স্মরণ করে বলেন, সেই সময় বাংলাদেশে মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণী (ক্লাস টুয়েলভ) পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল।
সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান সরকার নারীদের কেবল অর্থনৈতিকভাবেই স্বাবলম্বী করতে চায় না, বরং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের জন্য সব ধরনের সুযোগ উন্মুক্ত করতে চায়। এরই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, মেয়েদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে ডিগ্রি বা স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা অতিদ্রুত সম্পূর্ণ ফ্রি বা অবৈতনিক করে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা ফ্রি করার ফলে দেশের মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে আর কোনো আর্থিক বাধা থাকবে না। শুধু তাই নয়, নারী শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় আরও বেশি উৎসাহিত করতে যারা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল বা রেজাল্ট করবে, তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হবে।
চাঁদপুরের স্থানীয় অর্থনৈতিক ও শিল্পায়নের দাবির প্রতিও বিশেষ নজর দেন প্রধানমন্ত্রী। জনসভায় উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে একজন ‘ইপিজেড’ (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) প্রতিষ্ঠার দাবি সম্বলিত একটি প্ল্যাকার্ড বা সাইনবোর্ড উঁচিয়ে ধরলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবির ইতিবাচক জবাব দেন।
চাঁদপুরের স্থানীয় সন্তান এবং বর্তমানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডার) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনাদেরই সন্তান আশিক চৌধুরী এখানে আছে, যাকে বিডার চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়েছে। তাকে আমি আজ জনসমক্ষে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি, যত দ্রুত সম্ভব এই এলাকায় ইপিজেড স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য।”
তিনি স্পষ্ট করেন, সব দিক বিবেচনা করে এবং বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর যদি প্রকল্পটি ইতিবাচক হয়, তবে চাঁদপুর জেলায় একটি আধুনিক ইপিজেড দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর ফলে এই অঞ্চলের হাজার হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল জোয়ার আসবে।
দেশ গড়ার কাজে বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের ওপর বিশেষ জোর দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের বাইরে থেকে কোনো তৃতীয় পক্ষ এসে আমাদের এই সোনার বাংলাদেশ গড়ে দিয়ে যাবে না। যদি এই দেশের ২০ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হয়, তবে আমাদের নিজেদের শ্রম ও মেধার ওপরই ভরসা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী এক অনুপ্রেরণামূলক আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে হলে ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে দক্ষ শ্রমিকের শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। যেদিন আমরা এই বিশাল জনশক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে পারব, সেদিনই ইনশাআল্লাহ এ দেশের প্রতিটি মানুষের ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
বক্তব্যের শেষ অংশে এসে দেশের ঐতিহাসিক আন্দোলন ও সংগ্রামের চেতনার কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যেভাবে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, ঠিক একইভাবে চব্বিশের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের মাধ্যমে এ দেশের ছাত্র-জনতা দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বৈরাচারের পতনের পর এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশ গঠন করা। এখন আমাদের মূল কাজ হলো সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করা। এই দেশ গঠনের লড়াইয়ে সবাইকে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারের পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমদ মানিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশাল জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলনসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। দীর্ঘ ২২ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর এই চাঁদপুর সফরকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় যে অভূতপূর্ব গণজোয়ার ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে, তা আগামী দিনের রাজনীতি ও উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

