দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর চাঁদপুরের কুমারডুগী গ্রামের বাতাসে আজ এক ভিন্ন রাজনৈতিক আবহ। মাঠের ধুলো উড়িয়ে যখন সাধারণ মানুষ দলে দলে নদীর অববাহিকায় জড়ো হচ্ছিলেন, তখন তাদের চোখে ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা কাটিয়ে এক নতুন সূচনার প্রত্যাশা। ঠিক এই গ্রামীণ জনপদ থেকেই দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি এবং বিগত শাসনআমলের প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞের এক নির্মম খতিয়ান তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শনিবার বিকেলে চাঁদপুর সদরের বিশ্বখাল পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি সরাসরি আক্রমণ করেন বিগত সরকারের নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতিকে। চড়া রোদ আর মেঘনার বাতাসকে সাক্ষী রেখে প্রধানমন্ত্রী যখন দেশের অর্থনৈতিক সংকটের পেছনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করছিলেন, তখন সমবেত জনতার করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা।
তারেক রহমান তার বক্তব্যের শুরুতেই দেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য বিগত ১৬ বছরের শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, আমরা কেবল একটি নতুন সরকার গঠন করিনি, আমরা মূলত একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করেছি। বিগত দেড় দশকে এই দেশের মানুষের রক্ত জল করা লক্ষ-কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছে।
মেগা প্রকল্পের নামে হওয়া জাঁকজমকপূর্ণ উন্নয়ন যে আসলে ভেতরের শূন্যতাকে ঢাকবার একটা চেষ্টা ছিল, সে কথাই মনে করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, উন্নয়নের নামে এই দেশের মানুষের অর্থ তছরুপ করা হয়েছে। বড় বড় অবকাঠামোর গল্প শুনিয়ে ভেতরে ভেতরে পুরো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ফোকলা করে দেওয়া হয়েছিল, যার খেসারত এখন দেশের সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক লুটপাটের পাশাপাশি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর যে চরম ক্ষতি সাধন করা হয়েছে, তাও উঠে আসে তার বক্তৃতায়। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ দিন ধরে ঢালাওভাবে প্রশাসনকে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। এর ফলে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন হয়নি। প্রশাসনের যে সহজাত পেশাদারিত্ব এবং কাজের দক্ষতা, তা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার্থে।
একই সাথে দেশের স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনার দিকে ইঙ্গিত করে এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এক প্রকার সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার— যেন এই দেশের রোগীরা বাধ্য হয়ে আরেকটি প্রতিবেশী দেশের চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং দেশের টাকা বাইরে চলে যায়।
তবে অতীতের এই অন্ধকার অধ্যায়কে পেছনে ফেলে তার সরকার এখন জনকল্যাণমূলক ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতায় আসার আগে সাধারণ মানুষের কাছে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা কোনো ফাঁপা বুলি ছিল না। বিএনপি যা বলে, তা করে দেখায় এবং সেই কাজ ইতিমধ্যেই মাঠ পর্যায়ে শুরু হয়ে গেছে।
নির্বাচনের আগে সাড়া জাগানো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা মানুষকে কার্ড দেওয়া শুরু করেছি এবং এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। এর পাশাপাশি দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে খুব শীঘ্রই ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে কৃষকেরা সরাসরি সরকারি প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা পাবেন।
আজকের বিশ্বখাল পুনঃখনন কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরে সরকার প্রধান বলেন, খাল খননের এই উদ্যোগ কেবল একটি প্রতীকী কাজ নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি। এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সুপেয় পানি, সেচ সুবিধা এবং জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারের রাজনীতি কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনীতি নয়। আমাদের রাজনীতির মূল দর্শনই হলো সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা। যে কোনো মূল্যে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে এই সরকার বদ্ধপরিকর এবং গৃহীত সকল পরিকল্পনা সময়মতো বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে সরকারের এই সংস্কারমুখী ও জনবান্ধব উদ্যোগগুলো যখন আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে, তখন একটি মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে বলে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা যখন মানুষের কল্যাণে প্রতিশ্রুতি পালন শুরু করেছি, তখন কিছু সংক্ষুব্ধ মানুষ সাধারণের মাঝে বিভ্রান্তিমূলক কথা ছড়াচ্ছে। তারা চাইছে এই উন্নয়ন যাত্রাকে ব্যাহত করতে।
এই সমস্ত অপপ্রচারের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষকে সদাকর্তর্ক ও সজাগ থাকার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও দেশব্যাপী এই খাল খনন কর্মসূচির মতো জনকল্যাণমূলক কাজগুলোকে যাতে কেউ কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য সাধারণ জনগণকেই পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে।
দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ অত্যন্ত সচেতনভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দেশের মানুষ ভালো করেই জানত তাদের অধিকার কারা রক্ষা করতে পারবে। আর সেই সচেতনতার কারণেই তারা ব্যালটের মাধ্যমে বিএনপির পক্ষে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে।
জনগণের এই রায়কে একটি পবিত্র আমানত হিসেবে দেখছে নতুন সরকার। তারেক রহমান দৃঢ়তার সাথে বলেন, মানুষ আমাদের যে কাজের জন্য রায় দিয়েছে, যে দায়িত্ব আমাদের কাঁধে সঁপে দিয়েছে, সেসব কাজ আমরা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করবই। কোনো অপশক্তি বা বিভ্রান্তি তৈরি করে এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখা যাবে না।
ষড়যন্ত্রকারীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, যদি কেউ জনগণের উন্নয়ন কাজে বাধা দিতে চায়, তবে এ দেশের মানুষই তাদের সেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকে রাজপথে ভেস্তে দেবে। তিনি দেশের সাধারণ মানুষকে কোনো ধরনের উসকানি বা বিভ্রান্তিকারীদের পাতা ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে প্রধানমন্ত্রী তার দলের রাজনৈতিক শক্তির মূল উৎসের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, কোনো বিদেশি শক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠী নয়, সাধারণ জনগণই হলো বিএনপির একমাত্র রাজনৈতিক শক্তির উৎস। যতদিন দেশের মানুষের এই নিঃশর্ত সমর্থন ও ভালোবাসা আমাদের সাথে থাকবে, ততদিন আমরা দেশের জন্য কাজ করে যাব।
জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির এই লড়াই থেকে তার সরকার পিছপা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, মানুষের কল্যাণের পথ থেকে একবিন্দু এদিক-অদিক হবে না নতুন সরকার। সব ধরনের বাধা উপেক্ষা করে একটি স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় জানান তিনি।
চাঁদপুরের এই ঐতিহাসিক জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু, শিক্ষামন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলন এবং জেলা বিএনপির সভাপতি ও চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমদ মানিকসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
দীর্ঘ ২২ বছর পর চাঁদপুর জেলায় সরকার প্রধানের এই সফরকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলে যে অভূতপূর্ব সাড়া ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল, তা দুপুরের তপ্ত রোদকেও হার মানিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলিত চাঁদপুরের নদীভাঙন রোধ এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

