পদ্মা পাড়ের ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দানে তখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দুপুরের চড়া রোদ উপেক্ষা করে সকাল থেকেই সেখানে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। দীর্ঘ দিন পর রাজশাহীর মাটিতে এত বড় রাজনৈতিক জমায়েত দেখল নগরবাসী। ঠিক এমন একটি মুহূর্তেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
শনিবার বিকেলে ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে আয়োজিত এই বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন তিনি। বক্তব্যের শুরু থেকেই তার নিশানায় ছিল মাঠের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি। বর্তমান সরকারের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দমনে চরম ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে তিনি দলটির তীব্র সমালোচনা করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পুরোনো প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, নির্বাচনের আগে আপনাদের নেতা বলেছিলেন ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে। কিন্তু আজ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনারা ক্ষমতায় আসার পর নতুন এক নিয়ম চালু করেছেন। আপনারা বলছেন, সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু নেওয়া হলে সেটা নাকি চাঁদা হবে না। এই নীতির তীব্র ধিক্কার জানাই।
জনগণের বরাতে জামায়াত আমির বলেন, আপনাদের এই কর্মকাণ্ডের কারণে আজ মানুষের কাছে আপনাদের পরিচয় বদলে গেছে। যে দলটিকে মানুষ এক সময় ‘জাতীয়তাবাদী দল’ হিসেবে চিনত, আজ সাধারণ মানুষ ক্ষোভে-দুঃখে তাকে ‘চাঁদাবাজি দল’ বলে ডাকছে। দেশজুড়ে চলা এই চাঁদাবাজির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরকার কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আপনারা একজন চাঁদাবাজকেও আইনের আওতায় আনতে পারেননি, কবজায় নিতে পারেননি। এমন পরিস্থিতি থাকলে দেশের মানুষ এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবাই এই চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত। যদি তা না-ই হবে, তবে কেন দেশজুড়ে চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না? কেন সব ক্ষেত্রে দুর্নীতির এই মহোৎসব চলছে?
রাজশাহীর এই জনাকীর্ণ সমাবেশে শফিকুর রহমান কেবল মাঠের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। সরকারের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকেও আঙুল তোলেন তিনি। বিশেষ করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সেখানে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় একজন ‘দলকানা’ ও অयोग्य ব্যক্তিকে বসানো হয়েছে। এর ফলে দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
একই সাথে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান উপাচার্য ও প্রক্টর নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও ক্ষোভ জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, আপনারা এক সময় বলেছিলেন অতীতে রাজনৈতিক কারণে নিয়োগ দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানে পৌঁছাতে পারেনি। অথচ আজ আপনারাই দক্ষ ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রক্টর ও প্রভোস্টদের সরিয়ে দিয়ে নিজেদের পছন্দের অযোগ্য লোকদের বসাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই দলীয়করণকে জাতির সাথে এক ধরণের ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দেন তিনি। সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, প্রশাসনে যদি দেশপ্রেমিক ও দক্ষ মানুষদের সরিয়ে এভাবে অযোগ্যদের পুনর্বাসন করা হয়, তবে তার খেসারত শুধু এই জাতি দেবে না। এর প্রথম ধাক্কাটি আপনাদেরই সামলাতে হবে।
সমাবেশের মূল এজেন্ডা ছিল পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যা এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জামায়াত আমির ভারতের সাথে বিগত সরকারের নদী চুক্তির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রথম সরকার মাত্র ১৫ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালু করার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু দেখতে দেখতে ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও সেই ১৫ দিন আজও শেষ হয়নি।
এর ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের পরিবেশ ও কৃষির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা তুলে ধরেন তিনি। শুকনো মৌসুমে পদ্মা এখন মরুভূমিতে পরিণত হয় আর বর্ষায় তা ডেকে আনে মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ। সরকার সম্প্রতি পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের যে ঘোষণা দিয়েছে, তাকে স্বাগত জানালেও এটি যেন কেবল ‘লোক দেখানো’ কোনো প্রকল্প না হয়, সেই তাগিদ দেন তিনি।
একই সাথে ভারতের আপত্তি বা রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবি জানান শফিকুর রহমান। তিনি মনে করিয়ে দেন, বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী নির্বাচনের আগে তিস্তা পাড়ে বিশাল নির্বাচনী আমেজ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ভোটের পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন থমকে গেছে।
আঞ্চলিক রাজনীতির প্রসঙ্গে টেনে প্রতিবেশী দেশের প্রতি একটি কড়া বার্তাও দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। তিনি বলেন, প্রতিবেশী হিসেবে আমরা ভারতকে সম্মান করি। আমরা চাই না ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে কোনো বিভাজন বা অশান্তি তৈরি হোক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেখানে কেবল মুসলিম হওয়ার কারণে মানুষকে হেনস্তা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশের দিকে ‘লাল চোখ’ দেখানো হয়। কিন্তু মনে রাখবেন, এটা তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ আর শাহ মাখদুমের বাংলাদেশ। এই দেশের মানুষকে চোখ রাঙিয়ে লাভ নেই। আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি, তবে কেউ আমাদের শান্তিতে বিঘ্ন ঘটালে তা মেনে নেওয়া হবে না।
দেশের ২০ কোটি মানুষের নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন বিরোধীদলীয় এই নেতা। তিনি বলেন, এই দেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান— সকলের। এই মাটিতে যারা জন্ম নিয়েছে, তারা সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার ভোগ করবে। এটাই এ দেশের দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য।
যদি কেউ এই ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হানতে চায় বা কালো হাত বাড়ায়, তবে দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত তা রুখে দেবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিককে একজন ‘সাচ্চা পাহারাদার’ হয়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, আমাদের অধিকার কেউ পকেটে এনে দেবে না, লড়াই করেই তা আদায় করতে হবে।
দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সমাবেশ থেকে। ব্যাংক, বীমা ও বিভিন্ন কর্পোরেশনগুলোতে বড় ধরনের লুটপাট হয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, দেশে এখন শিক্ষিত বেকারদের দীর্ঘ মিছিল তৈরি হচ্ছে। তরুণদের কর্মসংস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা সরকারের কাছে নেই।
ইতিহাস চর্চার নামে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এখন প্রতিনিয়ত চর্চা হয় ৫৫ বছর আগে কে কী ছিল আর কে কী ভূমিকা রেখেছিল। যার যে ভূমিকা ছিল, তার জন্য আমরা তাকে স্যালুট জানাই। কিন্তু একটা জাতি যদি চিংড়ি মাছের মতো শুধু পেছনের দিকে তাকায়, তবে সেই জাতি জীবনেও সামনে এগিয়ে যেতে পারবে না।
ইতিহাস থেকে কেবল শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি দেশের মূল সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, দেশের চার ভাগের এক ভাগ এলাকা এখন প্রায় মরুভূমি হওয়ার পথে। দেশের ১৫৪টি অভিন্ন নদী আজ মৃতপ্রায়। নদী যদি ঠিকমতো না চলে, তবে খালের পানি কোত্থেকে আসবে? তাই সরকারের উচিত আগে নদীর দিকে নজর দেওয়া।
সবশেষে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু আইনি সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান। সুশাসনের জন্য জরুরি ছিল এমন ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সরকার বাতিল বা ফেলে দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এসব জনকল্যাণমুখী আইন পুনরায় চালু না করলে রাজপথ এবং সংসদ— দুই জায়গাতেই এক সাথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তিনি।
রাজশাহীর এই বিভাগীয় সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। যিনি সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য। সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের উপস্থিতিতে সমাবেশটি শেষ পর্যন্ত এক বিশাল গণজমায়েতে রূপ নেয়।

