তীব্র রোদ আর ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে সকাল থেকেই মানুষের চোখ ছিল মহাসড়কের দিকে। দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কুমিল্লার বরুড়ায় পা রাখলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার দুপুর ১টা ২০ মিনিটে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মীপুর খেলার মাঠে তৈরি অস্থায়ী পথসভা প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছায় তার গাড়ি বহর। সরকার প্রধানকে বহনকারী গাড়িটি মাঠের সীমানায় প্রবেশ করতেই অপেক্ষমাণ হাজার হাজার মানুষের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
গাড়ি থেকে নেমে প্রধানমন্ত্রী যখন ধীরপায়ে সভামঞ্চের দিকে এগিয়ে যান, তখন চারপাশের জনতা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। মঞ্চে উঠে তিনি উপস্থিত বিপুল জনসমাবেশের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। এ সময় মাঠের চারপাশ থেকে নেতাকর্মীরাও দলীয় পতাকা ও প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে প্রিয় নেতাকে পাল্টা শুভেচ্ছা জানান। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর বরুড়ার মাটিতে সরকার প্রধানের এই আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মাঝে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ঐতিহাসিক এই লক্ষ্মীপুর মাঠের সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক স্মৃতির সংযোগ বেশ পুরনো। এর আগে ২০০২ সালে বরুড়ার তৎকালীন জনপ্রিয় সংসদ সদস্য প্রয়াত এ কে এম আবু তাহেরের বিশেষ আমন্ত্রণে এই মাঠেই একটি বিশাল জনসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। মাঝখানের এই দীর্ঘ ২৪ বছরে দেশের রাজনীতিতে অনেক ঝড়-ঝাপটা গেছে। তবে বরুড়াবাসীর হৃদয়ে সেই স্মৃতি যে এখনও অমলিন, আজকের জনস্রোত তারই প্রমাণ দেয়।
শনিবার সকাল থেকেই বরুড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, গ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে লক্ষ্মীপুর মাঠের দিকে। দুপুরের আগেই মাঠের ভেতরের গণ্ডি পেরিয়ে লোক সমাগম ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের রাস্তাঘাট ও বাড়ির ছাদে। প্রিয় নেতাকে একবার চোখের দেখা দেখতে এবং তার মুখ থেকে আগামী দিনের দিকনির্দেশনা শুনতেই এই বিপুল উপস্থিতি। সমবেত নেতাকর্মীদের চোখে-মুখে ছিল এক ধরণের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের স্পষ্ট আভাস।
আজকের এই ঐতিহাসিক পথসভায় সভাপতিত্ব করছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমন। যিনি মূলত এই মাঠে তারেক রহমানকে প্রথম নিয়ে আসা প্রয়াত নেতা আবু তাহেরের সন্তান। পিতার স্মৃতিবিজড়িত এই মাঠে প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে পেরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের আবেগ ও উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। মন্ত্রীর অনুসারী ও স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা গত কয়েকদিন ধরেই এই মঞ্চ ও মাঠ প্রস্তুতের কাজ তদারকি করে আসছিলেন।
মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আরও উপস্থিত রয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিনসহ কুমিল্লার বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। সরকারের নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের মন্ত্রীদের এই উপস্থিতির কারণে পথসভাটি কেবল একটি রাজনৈতিক সমাবেশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, এই সফরের মাধ্যমে বরুড়ার কৃষি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে নতুন গতি আসবে।
সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুরো বরুড়া উপজেলাজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে প্রশাসন। সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুর মাঠ এবং এর সংযোগ সড়কগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি সাদা পোশাকেও পুলিশ ও র্যাবের সদস্যদের তৎপর থাকতে দেখা গেছে। একই সাথে দলীয় স্বেচ্ছাসেবকরাও মাঠের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যান।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বরুড়া সফর স্থানীয় রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। দীর্ঘ দিন পর সরকার প্রধানকে এত কাছ থেকে পেয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ক্লান্তি ও জড়তা কেটে গেছে। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের শীর্ষ নেতার এই মাঠ পর্যায়ের সফর কর্মীদের নতুন করে উজ্জীবিত করছে। সাধারণ মানুষও তার এই সফরকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
দুপুরের পর মাঠের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলে স্থানীয় নেতারা একে একে বক্তব্য দিতে থাকেন। বক্তারা তাদের বক্তব্যে বরুড়ার প্রয়াত নেতা আবু তাহেরের অবদান স্মরণ করেন এবং তার সুযোগ্য সন্তানের হাত ধরে এই অঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মঞ্চে উপবিষ্ট প্রধানমন্ত্রীও স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং মাঝে মাঝে হাত নেড়ে সাধারণ মানুষের স্লোগানের জবাব দেন।
সব মিলিয়ে, ২৪ বছর আগের সেই তরুণ রাজনৈতিক নেতার স্মৃতি বুকে নিয়ে বরুড়াবাসী আজ যেভাবে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিলো, তা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ দিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দুপুরের তপ্ত রোদও যেন সাধারণ মানুষের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের কাছে হার মেনেছে। এই সংক্ষিপ্ত পথসভা শেষ করেই প্রধানমন্ত্রী তার নির্ধারিত পরবর্তী কর্মসূচির অংশ হিসেবে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন বলে জানা গেছে।

