সকাল থেকেই মেঘনাপাড়ের জেলা চাঁদপুরে এক অন্যরকম আবহ। দীর্ঘ ২২ বছর পর সরকার প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে গোটা শহর এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো এখন লোকে লোকারণ্য। বিশেষ করে চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহ মাহমুদপুর ইউনিয়নে যেখানে প্রধানমন্ত্রী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন, সেই স্থানটি এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে।
শনিবার সকাল থেকেই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে সমাবেশস্থলের দিকে। খণ্ড খণ্ড মিছিল, স্লোগান আর দলীয় পতাকায় ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। নেতাকর্মীদের এই স্রোত কেবল সভামঞ্চের চারপাশেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ছড়িয়ে পড়েছে মাইলের পর মাইল সড়ক জুড়ে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর প্রিয় নেতাকে কাছ থেকে দেখার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না কেউই।
ভোর হওয়ার পর থেকেই চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলা, পৌরসভা এবং দূরবর্তী ইউনিয়নগুলো থেকে নেতাকর্মীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সভাস্থলের দিকে রওনা হন। বাস, মিনিবাস, ট্রলার কিংবা পায়ে হেঁটে— যে যেভাবে পেরেছেন, দুপুরের আগেই অনুষ্ঠানস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। দুপুরের কড়া রোদ উপেক্ষা করেই রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন হাজার হাজার মানুষ।
শাহ মাহমুদপুর ইউনিয়নের কুমারডুগী গ্রামের ঘোষের হাট এলাকার চিত্রটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে কয়েকদিন আগেও সাধারণ গ্রামীণ কর্মব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন শুধু মানুষের গুঞ্জন। স্থানীয় এক বিএনপি কর্মী জানান, তারা গত রাতেই কাছাকাছি এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন, যেন সকালে সবার আগে মাঠে পৌঁছাতে পারেন। মাঠের সামনের সারিতে জায়গা করে নেওয়ার জন্য ভোর থেকেই শুরু হয়েছিল এক নীরব প্রতিযোগিতা।
নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে পুরো চাঁদপুর জেলাকে। সমাবেশস্থল এবং প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের পথগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। একই সাথে দলের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক কর্মীরাও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মাঠের ভেতরে ও বাইরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর কেবল একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় সফর নয়। এটি এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। ২০০৪ সালের পর এই প্রথম তিনি চাঁদপুরের মাটিতে পা রাখছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরণের আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
চাঁদপুরের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বিশেষ করে নদীভাঙন রোধ, কৃষি খাতের উন্নয়ন এবং স্থানীয় যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আজ নতুন কোনো ঘোষণা দেবেন কি না, তা নিয়ে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সমাবেশ মাঠ— সর্বত্রই চলছে আলোচনা। জেলা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, আজকের এই ঐতিহাসিক সমাবেশ থেকে দেশনেতা চাঁদপুরের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবেন।
দুপুরের দিকে সমাবেশস্থলের আশপাশের সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে মানুষের অতিরিক্ত চাপের কারণে। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও ট্রাফিক বিভাগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের সুবিধার্থে স্থানীয় বাসিন্দারাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। খাবার পানি ও হালকা খাবারের অস্থায়ী দোকানগুলোতেও মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চাঁদপুর সফরকে ঘিরে পুরো জেলায় যে অভূতপূর্ব সাড়া ও গণজোয়ার তৈরি হয়েছে, তা গত কয়েক দশকের মধ্যে বিরল। সভামঞ্চ প্রস্তুত, জনতা প্রস্তুত এবং এখন কেবল অপেক্ষা সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন দীর্ঘ ২২ বছরের বিরতি ভেঙে চাঁদপুরের মাটিতে এসে দাঁড়াবেন সরকার প্রধান।

