চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১টি পরিবারের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বুধবার দুপুরে উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের উত্তর সাহেবগঞ্জ গ্রামে লাগা এই আগুনে ২০টি বসতঘর পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা বসতবাড়িগুলোকে গ্রাস করে নেয়। আগুনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, বাসিন্দারা তাদের জীবন বাঁচাতে পারলেও ঘর থেকে কোনো আসবাবপত্র বা মূল্যবান সম্পদ বের করতে পারেননি।
দুপুরের শান্ত গ্রামটি হঠাৎ করেই আর্তনাদ আর কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উত্তর সাহেবগঞ্জ গ্রামের ‘বেচার বাপের বাড়ির’ দেলোয়ার হোসেনের ঘর থেকে প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই এই আগুনের উৎপত্তি। চোখের পলকে আগুন এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। গ্রামবাসীরা শুরুতে নিজেদের উদ্যোগে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও বাতাসের তীব্রতায় তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
খবর পেয়ে ফরিদগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ফায়ার কর্মীদের প্রায় এক ঘণ্টার নিরলস চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে ১১টি পরিবারের অন্তত ২০টি ছোট-বড় ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে আসবাবপত্র, আলমারিতে থাকা নগদ টাকা, পরনের কাপড় এবং শেষ সম্বল স্বর্ণালংকার—সবই এখন কয়লার স্তূপ। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডে সব মিলিয়ে প্রায় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় বাড়িতে থাকা সুমি বেগম তার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী সুমি বলেন, “দুপুরে রান্না শেষ করে সবেমাত্র গোসল করতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ লোকজনের চিৎকার শুনে এসে দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে আমার ঘরেই। কিছু বোঝার আগেই আগুন পাশের ঘরগুলোতে চলে যায়। আমরা শুধু প্রাণ নিয়ে বের হতে পেরেছি, ঘর থেকে একটা সুঁই পর্যন্ত বের করতে পারিনি।”
আগুনে সব হারানো ইমরান হোসেন বলেন, “সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আমাদের ১১টি পরিবারের কারো ঘরেই এখন কিছু অবশিষ্ট নেই। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। সাজানো সংসারগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যে শ্মশান হয়ে গেল।” ইমরানের মতো আরও অনেক প্রতিবেশী এখন ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। তাদের চোখে-মুখে এখন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।
উত্তর সাহেবগঞ্জ গ্রামের এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় রয়েছেন মকবুল হোসেন, নজরুল ইসলাম তুষার, আইয়ুব আলী, আবুল কাশেম, আবুল খায়ের, ইমরান হোসেন, আবুল হাসেম এবং মামুনের পরিবার। তারা সবাই একে অপরের আত্মীয় এবং একই বাড়ির বাসিন্দা। তাদের বসতঘরগুলো ছিল পাশাপাশি, যার ফলে আগুন নেভানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই তা পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে গড়া এই ঘরগুলো এখন কেবল স্মৃতির অংশ।
ফরিদগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দলনেতা কামরুল ইসলাম অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই তাদের কর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি বলেন, “আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে। তবে আগুনের তীব্রতা এবং বসতঘরগুলো খুব কাছাকাছি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন ছিল। আমরা আগুন অন্য বাড়িগুলোতে ছড়ানো থেকে আটকাতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু যে ঘরগুলোতে আগুন লেগেছিল, সেগুলোর কোনো মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।”
বিকেলের দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির। তিনি ভস্মীভূত ঘরগুলো দেখে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্তরা বর্তমানে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। স্থানীয়ভাবে তাদের জন্য কিছু খাবার ও জরুরি আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। তবে স্থায়ীভাবে তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি সহায়তার বিকল্প নেই।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চাঁদপুর জেলা ও ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া জানান, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনা। আমরা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের জন্য শুকনো খাবার এবং জরুরি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।”
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে আরও জানা গেছে, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘর নির্মাণের জন্য ঢেউটিন এবং আর্থিক অনুদান প্রদানের সুপারিশ করা হবে। তবে প্রশাসনের এই আশ্বাস সত্ত্বেও ক্ষতিগ্রস্তদের মনে শান্তি নেই। ১১টি পরিবারের প্রায় অর্ধশতাধিক সদস্য এখন গৃহহীন। তাদের কাছে নেই কোনো অতিরিক্ত পোশাক কিংবা রাতের খাবারের সংস্থান। স্থানীয় গ্রামবাসীরা অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।
চাঁদপুরের গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ইদানীং আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পল্লী বিদ্যুতের পুরনো লাইন এবং নিম্নমানের ওয়ারিংকে এর জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফরিদগঞ্জের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল গ্রামীণ জনপদে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কথা। সরু রাস্তা এবং পানির উৎসের অভাবের কারণে অনেক সময় ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করে, যার চড়া মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।
উত্তর সাহেবগঞ্জ গ্রামের এই অগ্নিকাণ্ড কেবল বিশটি ঘর পুড়িয়ে দেয়নি, পুড়িয়ে দিয়েছে ১১টি পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও। কৃষিজীবী ও নিম্ন আয়ের এই মানুষগুলোর অনেকের সঞ্চয় বলতে ছিল ঘরে রাখা নগদ কিছু টাকা, যা কোরবানির ঈদ বা সন্তানদের পড়াশোনার খরচের জন্য রাখা হয়েছিল। আগুনে সেই স্বপ্নগুলোও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ আর পোড়া গন্ধ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই পরিবারগুলো তাকিয়ে আছে সরকারি ও বিত্তবানদের সহায়তার দিকে।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক এবং জনপ্রতিনিধিদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা বলেছেন, তারা যেন কেবল আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকেন। দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু না হলে এই পরিবারগুলোর পক্ষে আবার ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সহায়তা না এলে উত্তর সাহেবগঞ্জের এই ঘরগুলো হয়তো সহসা আর মেরামত করা হবে না।
ফরিদগঞ্জের এই ট্র্যাজেডি চাঁদপুর জেলাজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও গ্রামের বাতাসে এখনো পোড়া গন্ধ আর স্বজন হারানোদের আহাজারি ভাসছে। যারা কয়েক ঘণ্টা আগেও একটি সাজানো ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিলেন, আজ তাদের আশ্রয় কেবল দীর্ঘশ্বাস। এক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়তো পরিসংখ্যানে একটি সংখ্যা মাত্র, কিন্তু এই পরিবারগুলোর কাছে এটি ছিল তাদের জীবনের সবটুকু পুঁজি।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত দেলোয়ার বা সুমি বেগমরা কি পারবেন আবারও তাদের ঘরগুলো নতুন করে সাজাতে? না কি আগুনের এই ক্ষত তাদের জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেবে—সেই উত্তর সময়ের কাছেই তোলা রইল। আপাতত চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের এই প্রান্তিক গ্রামটিতে শুধুই স্তব্ধতা আর হাহাকার রাজত্ব করছে। সাহায্য না আসা পর্যন্ত তাদের রাতগুলো কাটবে খোলা আকাশের নিচের অবর্ণনীয় কষ্টে।

