সিলেটের জালালাবাদ থানাধীন সোনাতলা গ্রামের বাতাস আজ ভারী হয়ে আছে এক চার বছরের শিশুর বিদেহী আত্মার আর্তনাদে। শিশুটির নাম ফাহিমা আক্তার। যে বয়সে হাতে খেলনা আর মুখে আধো-আধো বুলি থাকার কথা, সেই বয়সে তাকে বরণ করতে হয়েছে এক বীভৎস মৃত্যু। আর এই নৃশংসতার কারিগর অন্য কেউ নন, স্বয়ং তার প্রতিবেশী এবং সম্পর্কে চাচা জাকির হোসেন।
গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে জাকির যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা শুনে খোদ দুঁদে পুলিশ কর্মকর্তাদেরও শিউরে উঠতে হয়েছে। জাকিরের ভাষায়, “ধর্ষণের চেষ্টাকালে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে জানাজানি হওয়ার ভয়ে আমি তাকে গলাটিপে হত্যা করি।” ঠান্ডা মাথার এই খুনি কেবল হত্যা করেই ক্ষান্ত হননি, লাশ গুম করতে চালিয়েছেন নানা ধূর্ত অপকৌশল।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকরা স্তম্ভিত হয়ে শোনেন এক নরপিশাচের হাতে একটি নিষ্পাপ প্রাণের অকাল ঝরে যাওয়ার গল্প। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জাকিরের গ্রেফতার এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
এসএমপির উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, গত ৬ মে থেকে নিখোঁজ ছিল শিশু ফাহিমা। ঘটনার পর থেকে খুনি জাকির হোসেন অত্যন্ত ধূর্ততার পরিচয় দিয়েছে। সে নিজেকে আড়াল করতে এবং মানুষের সন্দেহ এড়াতে এলাকাবাসীর সঙ্গে মিশে গিয়ে ফাহিমাকে খোঁজার নাটক করেছে। শুধু তাই নয়, পুলিশ যখন তদন্ত করতে এলাকায় যায়, জাকির ছায়ার মতো পুলিশের পাশেই ছিল।
স্থানীয়রা জানান, ফাহিমা নিখোঁজের পর যখন এলাকাবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং বিক্ষোভ মিছিল করে, খুনি জাকির সেই মিছিলের অগ্রভাগে ছিল। অপরাধ আড়াল করতে একজন মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, জাকিরের কর্মকাণ্ড যেন তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। তথ্য-প্রযুক্তির নিখুঁত জালে ধরা পড়ে যায় এই ধূর্ত খুনি।
জাকিরের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, গত ৬ মে সকালে সে ফাহিমাকে ২০ টাকা দিয়ে দোকান থেকে দুটি সিগারেট আনতে পাঠায়। সেই সময় জাকিরের বাড়িতে কেউ ছিল না। ইয়াবাসক্ত জাকির এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। শিশুটি সিগারেট নিয়ে ফিরলে সে তাকে ফুসলিয়ে নিজের ঘরের ভেতর নিয়ে যায়। সেখানে চলে পাশবিক নির্যাতনের চেষ্টা।
ভীত-সন্ত্রস্ত ফাহিমা যখন চিৎকার করতে চায় এবং বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন একপর্যায়ে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। জাকির বুঝতে পারে, ফাহিমা বেঁচে থাকলে তার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে। সেই ভয় থেকেই সে অচেতন শিশুটির গলাটিপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত। মুহূর্তের মধ্যে নিথর হয়ে যায় চার বছরের শিশুটি।
হত্যাকাণ্ডের পর জাকির লাশটি গুম করার পরিকল্পনা করে। সে একটি প্লাস্টিকের ব্রিফকেসে ফাহিমার দেহটি ভরে নিজের ঘরের ভেতর লুকিয়ে রাখে। দুই দিন সেই লাশের সঙ্গেই সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। গত ৮ মে যখন লাশ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে, তখন গভীর রাতে সুযোগ বুঝে পাশের একটি ডোবায় সেটি ফেলে দিয়ে আসে।
পুলিশ অভিযান চালিয়ে জাকিরের ঘর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সেই প্লাস্টিকের সুটকেস উদ্ধার করেছে। এ ছাড়া একটি ধূসর রঙের চাদর এবং শিশুটির রক্তমাখা বালিশ আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। খুনি জাকিরকে সোমবার রাতে জালালাবাদ থানা পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই উদ্ধার করা হয় সব আলামত।
এদিকে জাকিরকে গ্রেফতারের খবর সোনাতলা গ্রামে পৌঁছালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার গভীর রাতে শত শত বিক্ষুব্ধ জনতা জালালাবাদ থানা ঘেরাও করে। তাদের দাবি একটাই—খুনি জাকিরের দ্রুত বিচার এবং ফাঁসি। উত্তেজিত জনতার একটি অংশ জাকিরের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর ও ঘরবাড়ি তছনছ করে দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হত্যাকাণ্ডের সময় জাকির তার স্ত্রীর ওড়না ব্যবহার করেছিল শিশুটির মুখ চেপে ধরতে। সেই ওড়নাটিও পুলিশ উদ্ধার করেছে। মাদকাসক্তি যে একজন মানুষকে কতটা হিংস্র ও পশুর চেয়েও অধম করে তুলতে পারে, জাকির হোসেন তার এক করুণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মনজুরুল আলম বলেন, “এই ঘটনায় সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমরা ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর চার্জশিটে ধর্ষণের ধারাটিও আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হবে।” পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
সোনাতলা গ্রামের মানুষের মনে এখন শোক আর ক্রোধের মিশ্রণ। ফাহিমার মা-বাবার আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে। ছোট একটি ভুলের সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী চাচা কীভাবে এমন জঘন্য কাজ করতে পারল, সেই প্রশ্নই এখন সবার মুখে মুখে। মাদকের ভয়াবহতা গ্রাস করছে আমাদের সমাজকে, আর তার বলি হচ্ছে ফাহিমার মতো নিষ্পাপ শিশুরা।
আইনজীবীরা বলছেন, এই মামলায় জাকিরের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং উদ্ধারকৃত আলামত তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা যেন ন্যায়বিচারের পথে বাধা না হয়, সেই দাবিই জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। সিলেটে এর আগেও শিশু হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচারের নজির রয়েছে, ফাহিমা হত্যার ক্ষেত্রেও তেমনটিই প্রত্যাশা সবার।
শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ দমনে কেবল আইন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। প্রতিবেশীর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেললে সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়বে। জাকিরের মতো অপরাধীরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকে ছদ্মবেশে। তাদের চিনে নেওয়া এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সংবাদ সম্মেলন শেষে যখন পুলিশ কর্মকর্তারা বের হয়ে যাচ্ছিলেন, তখনো বাইরে সাধারণ মানুষের জটলা ছিল। সবার চোখেই ছিল জল আর মনে ছিল ঘৃণা। ফাহিমার কবরের মাটি এখনো ভেজা। সেই ভিজে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সোনাতলাবাসী আজ শপথ নিয়েছে, এই খুনের বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বে না।
একটি ছোট্ট প্রাণ, যার সামনে পড়ে ছিল বিশাল এক পৃথিবী, তা নিভে গেল নিছক পাশবিক লালসা আর মাদকাসক্তির কারণে। ফাহিমার এই মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কতটা অনিরাপদ এক সময়ে বাস করছি। ঘরের পাশেই ওত পেতে থাকে ঘাতক, যে কি না আবার বিপদে পাশে থাকার অভিনয়ও করে।
পুলিশের তৎপরতায় খুনি ধরা পড়লেও ফাহিমা আর ফিরে আসবে না। তবে তার খুনি জাকির হোসেনের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, তবে হয়তো অন্য কোনো ফাহিমা বেঁচে যাবে। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে দেশে শিশু নির্যাতনের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী বা নিকট আত্মীয়দের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। মাদক আর পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এই ধরণের অপরাধকে উস্কে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফাহিমা আক্তার আজ কেবল একটি নাম নয়, সে আজ একটি প্রতিবাদের প্রতীক। তার নিথর দেহের প্রতিটি ক্ষত যেন আমাদের বিচার ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলে বলছে, “আমি বিচার চাই।” সিলেটের মানুষ এখন সেই বিচার দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। ঘাতক জাকিরের ফাঁসির দড়িতে ঝোলার দৃশ্যই হয়তো এই ব্যথিত জনপদের ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত করতে পারবে।
সব শেষে, জালালাবাদ থানার পুলিশ সদস্যদের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করতে হয়। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তারা অতি অল্প সময়ে খুনিকে শনাক্ত করতে পেরেছেন। এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কত দ্রুত এই মামলার চূড়ান্ত রায় আসে। ফাহিমার বিদেহী আত্মা যেন অন্তত এইটুকু শান্ত্বনা পায় যে, তার খুনি পার পায়নি।
সিলেটের আকাশ আজ মেঘাচ্ছন্ন, যেন প্রকৃতির চোখেও জল। ফাহিমার মতো আর কোনো শিশু যেন এভাবে হারিয়ে না যায়, আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়—আজকের এই শোকাতুর দিনে এটাই সবার প্রার্থনা। সোনাতলা গ্রামের মেঠো পথে ফাহিমার পদচারণা আর কোনোদিন দেখা যাবে না, কিন্তু তার স্মৃতি প্রতিটি নাগরিকের মনে এক গভীর ক্ষত রেখে গেল।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে এই ধরণের ক্লুলেস এবং স্পর্শকাতর মামলাগুলোতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে রায় কার্যকর করা জরুরি। জাকির হোসেনের মতো নরপিশাচদের জন্য সমাজের কোনো স্তরেই যেন করুণার স্থান না থাকে। আইনের কঠোরতম প্রয়োগই পারে আগামীতে এই ধরণের অপরাধ রুখতে।
আজকের এই রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা যখন মানুষের কানে পৌঁছাবে, তখন প্রতিটি বাবা-মায়ের বুক কেঁপে উঠবে। নিজ আঙিনায় সন্তানদের আগলে রাখার দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে গেল। ফাহিমা আক্তার—একটি নাম, একটি দীর্ঘশ্বাস আর এক বিচার পাওয়ার যুদ্ধের শুরু। এই যুদ্ধে জয় হোক সত্যের, জয় হোক মানবতার।

