খাগড়াছড়ির রামগড়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি প্রশাসনিক অভিযানকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পাহাড়ি জনপদ। মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার রামগড় ইউনিয়নের পূর্ব বলিপাড়া এলাকায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা ও ইট-পাটকেলের আঘাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী শামীমসহ প্রশাসনের অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনসার সদস্যরা গুলিবর্ষণ করলে চারজন স্থানীয় গ্রামবাসীও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে। দীর্ঘদিন ধরেই রামগড় এলাকায় একটি প্রভাবশালী মহল পাহাড়ের বুক চিরে এবং নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছিল। এতে পরিবেশ ও স্থানীয় কৃষি জমি হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগ পাচ্ছিল প্রশাসন। এরই প্রেক্ষিতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন ইউএনও কাজী শামীম। অভিযানে রামগড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাজির আলমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল এবং আনসার সদস্যরা অংশ নেন।
প্রশাসন যখন বলিপাড়া এলাকায় পৌঁছে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার ও সেলো মেশিন ধ্বংস করতে শুরু করে, তখনই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অভিযান চলাকালে ছয় থেকে সাতটি সেলো মেশিন এবং কয়েকশ ফুট পাইপলাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তা ধ্বংস করা হয়। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেই লুকিয়ে ছিল উত্তেজনার বারুদ। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের সরঞ্জামের পাশাপাশি তাদের ফসলি জমিতে সেচের কাজে ব্যবহৃত মেশিন ও পাইপও ভেঙে ফেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
নিজের শেষ সম্বল সেচ যন্ত্রটি ধ্বংস হতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। মুহূর্তের মধ্যেই শত শত গ্রামবাসী জড়ো হয়ে প্রশাসনের পথরোধ করেন। শুরু হয় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, যা দ্রুতই রূপ নেয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা পাহাড়ের ঢাল থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। অতর্কিত এই আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েন ইউএনওর সঙ্গে থাকা কর্মীরা।
ইটের আঘাতে ইউএনও কাজী শামীমের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়। কেবল ইউএনও নন, জনতার রোশানলে পড়ে আহত হন সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল ওহাব জুয়েল, আনসার সদস্য নুর মোহাম্মদ, উপজেলা প্রশাসনের কর্মচারী জয়নাল আবেদীন, ইউএনওর গাড়িচালক কামাল হোসেন এবং এপিসি সালাউদ্দিন। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জীবন যখন সংকটাপন্ন, তখন নিরাপত্তার খাতিরে আনসার সদস্যরা ৫-৬ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেন।
গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আনসার সদস্যদের ছোঁড়া ছররা গুলিতে স্থানীয় আজাদ, সুমন, নূর হোসেন ও আবুল হাশেম গুরুতর আহত হন। সংঘর্ষ থেমে যাওয়ার পর ঘটনাস্থলে এক থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। দুই পক্ষই পিছু হটলে আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, কারও আঘাতই আপাতত প্রাণঘাতী নয়।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আহত গ্রামবাসী আবুল হাশেম তাঁর ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি। তিনি সংবাদকর্মীদের বলেন, “আমরা পেটের দায়ে চাষাবাদ করি। আমাদের সেচ মেশিনগুলো বালু তোলার মেশিন ছিল না। প্রশাসন কোনো বাছবিচার না করেই আমাদের সব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে তারা আমাদের ওপর গুলি চালায়। গরিব মানুষের কষ্টের মালের কি কোনো দাম নেই?” কৃষকদের এমন দাবি প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে এলাকায় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শামীম এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। তবে প্রশাসনের অন্য এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অবৈধ বালু খেকোরা কৃষকদের উস্কানি দিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সাধারণ কৃষকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধীরা পালিয়ে গেছে বলে দাবি করছে প্রশাসন। বালু উত্তোলনের ফলে যে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে, তা ঠেকাতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
রামগড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাজির আলম সন্ধ্যায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। প্রশাসনের ওপর হামলা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার বিষয়ে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। তবে এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
খাগড়াছড়ির এই পাহাড় ঘেরা জনপদে অবৈধ বালু উত্তোলনের সমস্যাটি বেশ পুরনো। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও স্থানীয় শক্তির মদতে দিনের পর দিন পাহাড় ও নদী ধ্বংস করা হচ্ছে। প্রায়ই এমন অভিযান চালানো হলেও এবারের মতো সরাসরি সংঘর্ষের ঘটনা বিরল। স্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা মনে করছেন, অভিযানের সময় সাধারণ কৃষকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ায় জনরোষের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের উচিত ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা।
বিকেলে সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়লে জেলা শহর খাগড়াছড়িতেও উত্তেজনা দেখা দেয়। পাহাড়ি এলাকার পরিবেশ ও ভূমি রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর ভূমিকার প্রশংসা অনেকে করলেও, সাধারণ মানুষের ওপর বলপ্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে রাবার বুলেটে সাধারণ গ্রামবাসী আহত হওয়ার ঘটনাটি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের মতে, আত্মরক্ষার অধিকার থাকলেও তা যেন সাধারণ মানুষের জানমালের জন্য কাল না হয়ে দাঁড়ায়।
বালু উত্তোলন কেবল একটি অবৈধ ব্যবসাই নয়, এটি পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষায় খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে পাহাড় ধসে যে প্রাণহানি ঘটে, তার অন্যতম কারণ এই অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন। প্রশাসন বারবার নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও সিন্ডিকেটের কাছে তা থোড়াই কেয়ার। মঙ্গলবারের এই অভিযান ছিল সেই সিন্ডিকেট ভাঙার একটি প্রচেষ্টা। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা এখন প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের তিলকে ঢাকা পড়ে গেল।
সন্ধ্যা নামার পর রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা গেছে। আহত ইউএনও এবং প্রশাসনিক কর্মচারীদের দেখতে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতালে ছুটে আসেন। তারা আহতদের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। অন্যদিকে, আহত গ্রামবাসীদের স্বজনরা বিমর্ষ মুখে হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষা করছেন। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ—মামলা-হামলার পরবর্তী ধকল তারা সামলাতে পারবেন তো?
প্রকৃতি ও মানুষের স্বার্থ যখন মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন প্রশাসনের ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল ভারসাম্যমূলক। মঙ্গলবারের এই ঘটনায় পাহাড়ের সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের যে আস্থার সংকট তৈরি হলো, তা কাটানো সহজ হবে না। পরিবেশ রক্ষা করতে গিয়ে যদি পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল মানুষদেরই শত্রু বানিয়ে ফেলা হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।
রামগড় থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনাস্থল থেকে কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে। যারা ইউএনওর ওপর সরাসরি পাথর ছুড়েছে, তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউপি সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলছে পুলিশ যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হয়। তবে গ্রামবাসীদের দাবি, তাদের সেচ মেশিনগুলো নষ্ট করার জন্য প্রশাসনকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
রাত যত বাড়ছে, রামগড়ের পূর্ব বলিপাড়া এলাকা ততই সুনসান হয়ে উঠছে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে থাকা ঘরগুলোর বাতি আজ হয়তো একটু আগেই নিভে গেছে। কিন্তু আজকের এই সংঘর্ষের রেশ পাহাড়ের বাতাসে অনেকদিন ভাসবে। অবৈধ বালু সিন্ডিকেটকে রুখতে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই সংঘাত দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য এক বড় শিক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়ে রইল।
সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করা এবং জনরোষ প্রশমন করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন কি আরও কঠোর হবে, নাকি এই সংঘর্ষের পর কৌশলী কোনো পথ খুঁজবে—সেদিকেই এখন নজর রাখছে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল। চব্বিশের বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে যখন প্রতিটি সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতার দাবি উঠছে, তখন রামগড়ের এই ঘটনা প্রশাসনের দক্ষতা ও দূরদর্শিতাকে নতুন করে পরীক্ষার মুখে ফেলে দিল।

