ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে দায়িত্ব পালনকালে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার তিন সদস্যকে জিম্মি করে নৃশংস হামলার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনপদ। সোমবার বিকেলের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রেশ ধরে রাতভর সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এক নারীসহ পাঁচজনকে আটক করেছে র্যাব। মঙ্গলবার দুপুরে জেলা শহরের দক্ষিণ পৈরতলায় র্যাব-৯-এর ক্যাম্পে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
নবীনগর উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের খাগাতোয়া গ্রামে সোমবার বিকেলে যখন র্যাব সদস্যরা সাধারণ পোশাকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছিলেন, তখন তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি কী বিভীষিকা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। স্থানীয়ভাবে ত্রাস হিসেবে পরিচিত ‘ডাকাত শফিক বাহিনী’র সদস্যরা অতর্কিতে র্যাবের তিন সদস্যের ওপর চড়াও হয়। কাজল, মালেক ও রাশেদ নামের ওই তিন সদস্যকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ডাকাতদের আস্তানায়।
র্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মো. নূরনবী সংবাদ সম্মেলনে জানান, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সময় র্যাব সদস্যদের জিম্মি করা কেবল একটি হামলা নয়, বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ। ডাকাত দলের সদস্যরা র্যাব সদস্যদের তাদের গোপন ডেরায় আটকে রেখে পৈশাচিক কায়দায় মারধর করে। বিশেষ করে এক সদস্যের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়, যার ফলে তিনি গুরুতর জখম হন।
খবর পাওয়ার পরপরই র্যাবের একটি শক্তিশালী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অপরাধীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। জিম্মি দশা থেকে উদ্ধার করা হয় রক্তাক্ত তিন সদস্যকে। এর পরপরই অপরাধীদের ধরতে পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে র্যাব। সোমবার গভীর রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত চলা এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে হামলায় সরাসরি জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় আভিযানিক দলটি।
আটককৃতরা হলেন—খাগাতোয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদির (৬২), রাহিম আহমেদ (২০), অপু মিয়া (১৯), নুর আলম (১৯) এবং ছানোয়ারা বেগম (৪৮)। র্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেফতারকৃত নারী হামলাকারীদের পালিয়ে যেতে এবং র্যাব সদস্যদের জিম্মি করে রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অভিযানের সময় ওই আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে এই হামলার মূল হোতা হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত ডাকাত শফিক এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশের খাতায় একাধিক মামলার আসামি শফিক এবং তার বাহিনীকে ধরতে নবীনগরের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। র্যাব কমান্ডার নূরনবী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শফিককে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত তাদের এই বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হাত তুলে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
গ্রামের সাধারণ মানুষের ভাষ্যমতে, খাগাতোয়া এলাকাটি অনেকদিন ধরেই শফিক বাহিনীর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় এবং স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তারা ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে ডাকাতি পর্যন্ত করে আসছিল। র্যাব সদস্যদের ওপর হামলার পর সাধারণ গ্রামবাসী এখন আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তবে র্যাব কর্মকর্তাদের আশ্বাস, অপরাধী ছাড়া সাধারণ মানুষের ভয়ের কোনো কারণ নেই।
আহত র্যাব সদস্যদের বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতপ্রাপ্ত সদস্যের অবস্থা এখন আশঙ্কামুক্ত হলেও সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। বাকি দুজনও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতজনিত কারণে ব্যথায় ভুগছেন। তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরণের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে অপরাধী চক্রগুলো কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাধারণ পোশাকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সময় এমন হামলার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কৌশলগত দিকগুলোকেও নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে ডাকাত বাহিনীর আস্তানায় জিম্মি হওয়ার বিষয়টি পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
র্যাব-৯ এর এই ত্বরিত পদক্ষেপে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও শফিকের পলায়ন স্থানীয়দের মনে অস্বস্তি জিইয়ে রেখেছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ এবং থানা পুলিশও এই অভিযানে র্যাবকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে। পুরো নবীনগর উপজেলায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ ও র্যাবের একাধিক গাড়ি টহল দিচ্ছে মোড়ে মোড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, নদীবেষ্টিত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। অপরাধীরা এসব এলাকাকে ‘সেফ জোন’ হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই হামলা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি সংগঠিত অপরাধী চক্রের আস্ফালন। তাই কেবল আটক নয়, এসব চক্রকে সমূলে উৎপাটন করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয় যে, আটককৃতদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা প্রদান, জিম্মি করে নির্যাতন এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। দ্রুতই তাদের আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে। র্যাব কর্তৃপক্ষ দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে যে, এই হামলার সঙ্গে নেপথ্যে যারাই যুক্ত থাক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। রতনপুর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের দাবি, এই এলাকায় স্থায়ী পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হোক যেন আর কোনো শফিক বাহিনী মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। মেহনতি মানুষেরা যেন নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের বড় পরীক্ষা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাতাসে এখন বারুদের গন্ধ আর ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষা। র্যাবের আভিযানিক সক্ষমতা আর অপরাধীদের ধূর্ততার লড়াইয়ে জয় শেষ পর্যন্ত আইনের শাসনেরই হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন জেলার সচেতন নাগরিকরা। খাগাতোয়া গ্রামের সেই টিনের চালাগুলো আজ নীরব সাক্ষী হয়ে আছে এক রক্তক্ষয়ী বিকেলের, যা বদলে দিয়েছে পুরো নবীনগরের শান্ত মেজাজকে।
বিকেলের সূর্য যখন দিগন্তে হেলে পড়ছে, তখনো র্যাবের গাড়িগুলো খাগাতোয়া গ্রামের মেঠো পথে ধুলো উড়িয়ে যাতায়াত করছে। শফিক ডাকাতের ছায়া এখনো কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে, আর তাকে খুঁজে বের করতেই র্যাবের প্রতিটি সদস্য এখন বদ্ধপরিকর। জিম্মি হওয়া সহকর্মীদের রক্তের দাগ মোছার একটাই উপায়—সব অপরাধীকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।
আগামী কয়েকদিন নবীনগর এলাকাটি গোয়েন্দা নজরদারির অধীনে থাকবে বলে জানানো হয়েছে। উদ্ধারকৃত দেশীয় অস্ত্রগুলো আদালতের নির্দেশে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এটিই জানান দিচ্ছে যে, অপরাধীদের কোনো সীমানা নেই এবং তাদের দমনে রাষ্ট্র সর্বদা প্রস্তুত। আজকের এই গ্রেফতার কেবল একটি শুরু মাত্র, চূড়ান্ত গন্তব্য অপরাধমুক্ত এক নিরাপদ বাংলাদেশ।

