মাদারীপুর জেলার সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুর গ্রামটি আজ আর অন্য আট-দশটি সাধারণ গ্রামের মতো নেই। চারদিকে এক স্তব্ধতা, বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় যেন মিশে আছে হাহাকার। গ্রামের ধুলোমাখা মেঠো পথ ধরে আজ কোনো স্বপ্ন নয়, বরং কফিনবন্দী হয়ে ফিরেছেন এক মেধাবী প্রাণ।
নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি—এই নামটি কেবল একটি পরিচয় ছিল না, এটি ছিল একটি পরিবারের আলোকবর্তিকা। অনেক স্বপ্ন আর বুক ভরা আশা নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে। লক্ষ্য ছিল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করা। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাঝপথেই থেমে গেল এক মার্কিন রুমমেটের নৃশংসতায়।
শনিবার দুপুরের সূর্যটা যখন মাথার ওপরে, ঠিক তখনই বৃষ্টির মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি চরগোবিন্দপুর গ্রামে এসে পৌঁছায়। গাড়িটির দরজা খোলার সাথে সাথেই কান্নার রোল পড়ে যায় পুরো এলাকায়। আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে প্রতিবেশী—কারো চোখই শুষ্ক ছিল না। এক নজর দেখার জন্য মানুষের ঢল নেমেছিল বৃষ্টির পৈতৃক বাড়িতে।
আইনি জটিলতা আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে বৃষ্টির নিথর দেহটি দেশে ফিরেছে। পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন ঈদ উদযাপনে বৃষ্টি ফিরবেন হাসি মুখে। আগামী ১৭ মে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। বাবা-মায়ের জন্য কত কী কেনাকাটা করার কথা ছিল তার। কিন্তু নিয়তি সব পরিকল্পনা ওলটপালট করে দিল।
বিকেলে চরগোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বৃষ্টির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় হাজারো মানুষ সেই জানাজায় শরিক হন। জানাজা শেষে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পারিবারিক কবরস্থানে। সেখানে তার পরম শ্রদ্ধেয় দাদা-দাদির কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এই উদীয়মান বিজ্ঞানীকে।
বৃষ্টির বাবা জহিরুল ইসলাম আকন, যিনি পেশাগত কারণে ঢাকায় সপরিবারে বসবাস করেন, আজ একেবারে ভেঙে পড়েছেন। তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ, চোখ দুটি লাল হয়ে আছে নিরন্তর কান্নায়। তিনি বলেন, “আমার মেয়েটা দেশের জন্য কাজ করতে চেয়েছিল। নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশা ছিল ওর। এখন আমার আর কোনো চাওয়া নেই, শুধু বিচার চাই।”
বৃষ্টির মা আইভি বেগমের অবস্থা আরও করুণ। মেয়ের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করে অনেক কষ্টে মেয়েকে বড় করেছিলেন জহিরুল সাহেব। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং বুয়েট থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করার পর বৃষ্টি যখন ফুল স্কলারশিপ পেলেন, তখন আনন্দের সীমা ছিল না এই পরিবারের।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় পড়াশোনা শুরু করার মাত্র নয় মাসের মাথায় গত ১৬ এপ্রিল নিখোঁজ হন বৃষ্টি এবং তার বন্ধু জামালপুরের লিমন। প্রায় এক সপ্তাহ পর ফ্লোরিডার টাম্পা এলাকায় তাদের দেহাবশেষ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর থেকে বৃষ্টির খণ্ডিত দেহ উদ্ধার করা হয়, যা এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা প্রমাণ করে।
এই নৃশংস ঘটনার পেছনে অভিযুক্ত হিসেবে হিশাম আবুগারবিয়েহ নামক এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে মার্কিন পুলিশ। সে ছিল বৃষ্টির বন্ধু লিমনের রুমমেট। বর্তমানে সে কারাগারে থাকলেও বৃষ্টির পরিবারের মনে কেবল একটিই প্রশ্ন—কেন এই নিষ্ঠুরতা? কেন কোনো অপরাধ ছাড়াই প্রাণ দিতে হলো এক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীকে?
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বৃষ্টির মেধার মূল্যায়ন করে তাকে মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। এই অর্জন পরিবারের জন্য একদিকে যেমন গৌরবের, অন্যদিকে প্রচণ্ড যন্ত্রণার। কারণ যার পাওয়ার কথা ছিল এই সনদ, সে আজ কবরের অন্ধকারে। কাগজের সেই ডিগ্রি বৃষ্টির অভাব পূরণ করতে পারবে না কখনোই।
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা সাবাব জানাজায় উপস্থিত হয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, সরকারিভাবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দোষী ব্যক্তি যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাস সজাগ রয়েছে।
চরগোবিন্দপুর গ্রামের সাধারণ মানুষও ক্ষুব্ধ। তাদের ভাষায়, বৃষ্টি কেবল একটি পরিবারের মেয়ে ছিল না, সে ছিল গ্রামের গর্ব। গ্রামীণ পরিবেশ থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা করে নেওয়া সহজ ছিল না। বৃষ্টির এই প্রস্থান কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি একটি মেধার অপমৃত্যু।
বৃষ্টির বাবা জহিরুল ইসলামের স্বপ্ন ছিল মেয়ে পিএইচডি শেষ করে বাড়িতে এসে নতুন ভবনের উদ্বোধন করবে। সেই ভবনটি হয়তো তৈরি হবে, কিন্তু সেটি আর কোনোদিন বৃষ্টির পদচারণায় মুখরিত হবে না। ১৭ মে’র সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি আসবে, কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বৃষ্টিকে নিয়ে আসার জন্য কোনো উৎসবের আমেজ থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিদেশের মাটিতে বর্ণবাদ বা ব্যক্তিগত আক্রোশ কীভাবে একজন শিক্ষার্থীর জীবন কেড়ে নিতে পারে, বৃষ্টির ঘটনা তার এক চরম উদাহরণ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছে।
মাদারীপুরের আকাশ আজ মেঘাচ্ছন্ন। চরগোবিন্দপুরের প্রতিটি ঘর থেকে যেন দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসছে। বৃষ্টির কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার স্বজনরা যখন শেষবারের মতো বিদায় দিচ্ছিলেন, তখন প্রকৃতিও যেন নিস্তব্ধ হয়ে সেই শোকের সঙ্গী হয়েছিল। এই মেধাবীর রক্ত বৃথা যাবে না, যদি ঘাতকের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত হয়।
সন্ধ্যা নেমেছে মাদারীপুরে। বৃষ্টির কবরের পাশে মোমবাতি জ্বলছে হয়তো। কিন্তু সেই প্রদীপের আলো কি পারবে বৃষ্টির পরিবারের মনের অন্ধকার দূর করতে? উত্তরটি কারো জানা নেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বৃষ্টির এই ত্যাগের কথা এবং তার মেধার স্বাক্ষর চরগোবিন্দপুর তথা বাংলাদেশ কোনোদিন ভুলবে না।
এই ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি সফলতার গল্পের পেছনে থাকে এক একটি জীবনযুদ্ধের কাহিনী। বৃষ্টির সেই যুদ্ধটি ছিল শিক্ষার, প্রগতির। ঘাতকের ছুরি সেই যাত্রা থামিয়ে দিলেও, বৃষ্টির স্বপ্নগুলো বেঁচে থাকবে তার কাজের মাধ্যমে, আর বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা প্রতিটি কণ্ঠে।
দেশের মাটিতে শেষবারের মতো মিশে গেলেন নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। বিদেশের মাটিতে শুরু হওয়া এক রঙিন স্বপ্নের অবসান হলো চিরচেনা মাটির গন্ধে। এখন কেবল একটাই প্রতিধ্বনি—বিচার চাই, এই নির্মমতার অবসান চাই। বৃষ্টির আত্মা শান্তিতে থাকুক, এই প্রার্থনাই আজ সবার মুখে মুখে।

