সাতসকালে নিস্তব্ধতা ভেঙে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউতকোনা গ্রামে এখন কেবলই শোকের মাতম। জীবিকার তাগিদে গোপালগঞ্জ থেকে আসা একটি সাজানো পরিবার নিমেষেই শেষ হয়ে গেল। শনিবার সকালে প্রবাসী মনির হোসেনের কলোনির একটি কক্ষ থেকে যখন একের পর এক পাঁচটি নিথর দেহ বের করে আনা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত প্রতিবেশীদের চোখেও ছিল অবিশ্বাসের জল।
তদন্তকারীদের মতে, শুক্রবার রাতের কোনো এক সময় এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামতগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে এক গভীর ও পরিকল্পিত প্রতিহিংসার দিকে। গৃহকর্তা ফুরকান মিয়া এখন পুলিশের প্রধান সন্দেহভাজন, যিনি ঘটনার পর থেকেই লাপাত্তা। তবে পালিয়ে যাওয়ার আগে তিনি রেখে গেছেন নিজের ‘ডায়েরি অফ গ্রিভেন্স’ বা অভিযোগের পাহাড়।
পুলিশ যখন ঘরের ভেতর তল্লাশি চালাচ্ছিল, তখন মৃতদেহগুলোর পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল কম্পিউটারে টাইপ করা দুটি অভিযোগপত্র। সেখানে ফুরকান তার স্ত্রী শারমিন বেগমের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং পরকীয়ার অভিযোগ এনেছেন। এমনকি একটি চিরকুটে তিনি আগে থেকেই লিখে রেখেছিলেন যে, তিনি সবাইকে মেরে ফেলবেন। কিন্তু সেই হুমকি যে বাস্তবে রূপ নেবে, তা ভাবতে পারেননি স্বজনরা।
ভাড়া করা সেই ছোট দুটি কক্ষ এখন কেবলই রক্তের সাক্ষী। এক কক্ষে খাটের ওপর কম্বল দিয়ে ঢাকা ছিল শ্যালক রসুল মিয়ার ক্ষতবিক্ষত দেহ। অন্য কক্ষে পড়ে ছিল তিন নিষ্পাপ শিশু—১৫ বছরের মীম, ৮ বছরের মারিয়া এবং মাত্র ২ বছরের ছোট্ট ফরিদ। তাদের সবারই গলা কাটা ছিল। সবচেয়ে বীভৎস দৃশ্যটি ছিল শারমিন বেগমের; জানালার গ্রিলের সাথে হাত-পা বেঁধে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
প্রতিবেশী রেহানা বেগম জানান, ফুরকান ও শারমিনের মধ্যে বিবাদ ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘর থেকে প্রায়ই চিৎকার ভেসে আসত। তবুও এমন ভয়ংকর পরিণতির কথা কেউ আঁচ করতে পারেননি। গ্রামবাসীর মনে একটাই প্রশ্ন—মা-বাবার বিবাদে ওই অবুঝ শিশুদের কী অপরাধ ছিল? কেন তাদের এভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো?
নিহত শারমিনের পরিবার অবশ্য ফুরকানের আনা পরকীয়ার দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। শারমিনের চাচি ইভা রহমানের অভিযোগ, যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই শারমিনের ওপর নির্যাতন চালাতেন ফুরকান। এই নিয়ে একাধিকবার সালিসও হয়েছে। ইভার দাবি, শ্যালক রসুলকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে এনে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে যাতে কোনো সাক্ষী না থাকে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন শারমিনের বাবা শাহাদাত হোসেন। তিনি জানান, ফুরকান নিজেই ফোন করে স্বজনদের জানিয়েছিলেন যে তিনি সবাইকে মেরে ফেলেছেন। ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া একটি মদের বোতল এবং রান্না করা সেমাই। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন যে, খাবারের সাথে কোনো চেতনানাশক মিশিয়ে সবাইকে অচেতন করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কি না।
কাপাসিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিনুর আলম জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া কাগজপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সেগুলোতে কোনো তারিখ বা স্বাক্ষর নেই, এমনকি অন্য থানার নামও উল্লেখ আছে। এটি কি বিভ্রান্ত করার চেষ্টা, নাকি আগে থেকেই সাজানো কোনো ছক—তা বের করতে কাজ করছে পুলিশের একাধিক টিম।
কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, “প্রাথমিক আলামতে মনে হচ্ছে পারিবারিক বিরোধই এই নৃশংসতার মূল কারণ। তবে অর্থ আত্মসাৎ ও পরকীয়ার যে অভিযোগগুলো কাগজে লেখা আছে, সেগুলো তদন্ত সাপেক্ষ।” ইতোমধ্যে নিহতের বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন এবং পলাতক ফুরকানকে ধরতে সাড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনা গাজীপুরসহ পুরো দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একদিকে মাদকের সম্পৃক্ততা, অন্যদিকে সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়—সব মিলিয়ে এক অন্ধকার চিত্র ফুটে উঠেছে এই ট্র্যাজেডিতে। একটি পরিবারের অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার এই ঘটনায় এখন কেবল বিচারের অপেক্ষা করছে রাউতকোনা গ্রামের মানুষ।

