বাংলাদেশ সচিবালয়ে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) চলতি অর্থবছরের ১০ম সভা সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে উত্থাপিত ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে আজকের এই সভাটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সভায় আলোচিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অধিকাংশের অনুমোদন মিললেও বেশ কিছু প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিশেষ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল অর্থ বরাদ্দ নয়, বরং প্রতিটি প্রকল্পের উপযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কঠোরভাবে যাচাই করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী খুব স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে প্রতিটি সরকারি পয়সা ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী হতে হবে। কোনো অপ্রয়োজনীয় খাতে যেন অর্থের অপচয় না হয়, সেটি নিশ্চিত করা বর্তমান প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অনেক চলমান বা প্রস্তাবিত প্রকল্প যা বিগত সময়ে নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো পুনরায় মূল্যায়ন বা রিভিউ করা হচ্ছে। এর ফলে যে প্রকল্পগুলো বর্তমান বাস্তবতায় অকার্যকর বলে প্রতীয়মান হবে, সেগুলো থেকে সরকার সরে আসতে দ্বিধা করবে না।
জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে প্রকল্পের সামঞ্জস্যতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সভার আলোচনায় উঠে এসেছে যে, প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকতে হবে সাধারণ মানুষের স্বার্থ। কেবল অবকাঠামোগত চটকদারি নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে কীভাবে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের উপকার করা যায়, তা খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট সচিবদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আজকের এই নীতিনির্ধারণী সভায় স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবরা আলোচনায় অংশ নেন।
প্রতিমন্ত্রী সাকি আরও জানান, একনেক সভায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি বাড়ানো হবে। ব্যয় নির্ধারণে যৌক্তিকতা যাচাই করা এবং দুর্নীতির ছিদ্রপথ বন্ধ করা সরকারের অগ্রাধিকার। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের বোঝা কমাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংস্থান এবং টেকসই বিনিয়োগের দিকে নজর দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, যে দুটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি, সেগুলোকে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য ও যৌক্তিক ব্যয় কাঠামোর ভিত্তিতে পুনরায় পেশ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই কঠোর অবস্থান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন এক স্বচ্ছতার বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ব্যয় সংকোচন নীতি এবং প্রকল্পের ‘প্রায়োরিটাইজেশন’ বা অগ্রাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একনেকের এই কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জনকল্যাণমুখী প্রকল্পে বরাদ্দ নিশ্চিত করে অনুৎপাদনশীল খাত থেকে সরে আসা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
আজকের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অনুমোদিত ১৫টি প্রকল্পের কাজ দ্রুততম সময়ে শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে যেন কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা বা বাজেট সংশোধন না লাগে, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে আইএমইডি এবং পরিকল্পনা বিভাগকে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকার তার উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বদ্ধপরিকর বলে সংবাদ সম্মেলনে পুনর্ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
বিকালে ব্রিফিং শেষ করে প্রতিমন্ত্রী পুনরায় সচিবালয়ের দপ্তরে ফিরে যান, যেখানে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর প্রশাসনিক আদেশ জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আজকের এই একনেক সভা কেবল প্রকল্প পাসের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং এটি ছিল প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার এক নতুন পরীক্ষা। সরকারের এই পদক্ষেপে জনগণের ট্যাক্সের টাকার সঠিক ব্যবহারের নিশ্চয়তা মিলবে বলে দাবি করছে নীতিনির্ধারক মহল।

