সাতসকালে ব্যাগ-প্যাক আর ছোট বাচ্চা নিয়ে বাস টার্মিনালে এসে থমকে দাঁড়িয়েছেন শিউলি বেগম। গন্তব্য ঢাকা, কিন্তু কাউন্টারগুলো সব বন্ধ। কোনো ঘোষণা নেই, নেই কোনো আগাম সতর্কতা। শিউলি বেগমের মতো শত শত মানুষের চোখে-মুখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা আর বিরক্তি। রাজশাহী ও নাটোর বাস মালিকদের মধ্যকার পুরনো এক দ্বন্দ্বের জেরে দ্বিতীয় দিনের মতো অচল হয়ে পড়েছে রাজশাহীর দূরপাল্লার রুট।
বুধবার সকাল থেকেই রাজশাহী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও শিরোইল বাস টার্মিনালে মানুষের ভিড় উপচে পড়লেও কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই অচলাবস্থা কাটেনি আজও। ফলে রাজশাহীর সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তবে আঞ্চলিক রুট হিসেবে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সীমিত পরিসরে বাস চলাচল করলেও যাত্রীদের প্রধান গন্তব্য রাজধানীমুখী পথগুলো এখনো রুদ্ধ।
ভুক্তভোগী যাত্রী শফিকুল আজিম তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “কালও চেষ্টা করেছি যেতে পারিনি। ভেবেছিলাম আজ হয়তো বাস চলবে। ছোট বাচ্চা আর পরিবার নিয়ে স্টেশনে এসে দাঁড়িয়ে থাকা যে কত কষ্টের, তা বলে বোঝানো যাবে না। কাউন্টারের লোকরাও বলতে পারছে না ঠিক কবে নাগাদ চাকা ঘুরবে।” এই অনির্দিষ্টকালের অপেক্ষা এখন সাধারণ যাত্রীদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে কোনো উপায় না পেয়ে অনেকে সিএনজি বা ভাড়ায় চালিত প্রাইভেটকারে চড়ে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এই সুযোগে চালকরাও হাকছেন অতিরিক্ত ভাড়া। স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি টাকা গুনে বাধ্য হয়েই যাতায়াত করছেন জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া যাত্রীরা। আবার পকেটে টান থাকায় রফিকুল ইসলামের মতো অনেককে বাধ্য হয়েই মালপত্র নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে বাড়িতে।
মালিক পক্ষ সূত্রে জানা গেছে, রুট পারমিট আর বাস চলাচলের সময়সূচি নিয়ে নাটোর ও রাজশাহী বাস মালিকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের রেষারেষি রয়েছে। মাঝেমধ্যেই এই সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং তার বলির পাঁঠা হয় সাধারণ মানুষ। এবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় আলোচনার পথ দীর্ঘ হচ্ছে আর ভোগান্তি বাড়ছে রাজপথের যাত্রীদের।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল অবশ্য আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে আজ দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি জরুরি বৈঠকের কথা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরাও চাই না মানুষ কষ্ট পাক। কিন্তু আমাদের কিছু দাবি ও শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। আশা করছি প্রশাসনের মধ্যস্থতায় আজই একটি সমাধান বেরিয়ে আসবে।”
কূটনৈতিক আলাপ আর টেবিল বৈঠকের মধ্য দিয়ে হয়তো আজ বিকেলের দিকে বাস চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে, এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে টার্মিনাল এলাকায়। তবে যাত্রী সাধারণের দাবি, বারবার কেন মালিকপক্ষের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষের যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া হবে? জনস্বার্থকে এভাবে বন্ধক রেখে পরিবহণ ধর্মঘটের সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজ।
ততক্ষণ পর্যন্ত রাজশাহীর বাস কাউন্টারগুলোতে বিরাজ করছে শুনশান নীরবতা। কেবল টার্মিনালের সামনে কিছু জটলা আর মানুষের দীর্ঘশ্বাসই জানান দিচ্ছে যে, সড়কের এই অবরোধ কেবল যানবাহনের নয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রারও গতিরোধ করেছে। প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছেন হাজারো ঘরমুখো ও কর্মস্থলগামী যাত্রী।

