বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ আজ রূপ নিয়েছিল জনসমুদ্রে। সোমবার সন্ধ্যায় জেলা বিএনপি আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ‘সংস্কার’ নিয়ে চলমান বিতর্ক নিয়ে কড়া মন্তব্য করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল এখন ‘সংস্কার সংস্কার’ বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, অথচ তাদের মুখে দেশের অর্ধেক জনশক্তি—নারীদের উন্নয়ন বা স্বাধীনতা নিয়ে কোনো কথা নেই।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। সংবিধান থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও নারী অধিকারসহ নানা বিষয়ে প্রস্তাবনা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মহল কেবল সংবিধান পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে পড়ে আছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “যারা জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তারা নারীর স্বাধীনতা বা উন্নয়ন নিয়ে চুপ কেন? মানুষের চিকিৎসার জন্য গঠিত কমিশন বা ওষুধ প্রাপ্তি সহজ করার বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই কেন?”
তারেক রহমান সাম্প্রতিক একটি ব্যক্তিগত ঘটনার রাজনৈতিক অপব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একটি সাধারণ পারিবারিক বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়কে কিছু মহল রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা করেছে। এই ষড়যন্ত্রকারীদের অতীত ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে ৮৬, ৯৬ কিংবা ২০০৮ সালের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে এরা জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। তিনি তৃণমূলের কর্মীদের এদের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী এবং খাল খননের মতো জনবান্ধব কাজ করছে। যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু একদল ষড়যন্ত্রকারী এসব উন্নয়নমূলক কাজের বিরোধিতা করে পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করছে। তারা জনগণের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে বেশি আগ্রহী।
বিএনপির সংস্কার ভাবনার ধারাবাহিকতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “২০১৬ সালে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ‘ভিশন ২০৩০’ উপস্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে আমরা সব রাজপথের সঙ্গীদের নিয়ে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছি।” তিনি আরও বলেন, যখন স্বৈরাচারের ভয়ে কেউ সংস্কারের ‘স’ শব্দটিও উচ্চারণ করতে সাহস পায়নি, তখন বিএনপিই প্রথম বিস্তারিত সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে তুলে ধরেছিল। গত ১৬ বছরে যে ধ্বংসস্তূপ তৈরি করা হয়েছিল, সেখান থেকে দেশকে টেনে তুলতেই এই ৩১ দফা।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কমিশনের কাছে বিএনপি জনগণের পক্ষ থেকে তাদের স্পষ্ট মতামত জমা দিয়েছে। তিনি বলেন, “গণতন্ত্রে সবার সাথে সব বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি নয়। আমাদের কোথায় ঐক্য আর কোথায় দ্বিমত, তা আমরা খোলাখুলিভাবে কমিশন এবং জনগণের কাছে পরিষ্কার করেছি। আমাদের কোনো লুকোচুরি নেই।”
উল্লেখ্য, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নিজ জেলা সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী সোমবার এক ব্যস্ততম দিন অতিবাহিত করেছেন। সকালে সড়কপথে বগুড়া পৌঁছে তিনি জেলা জজ আদালতে ‘ই-বেইল বন্ড’ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এরপর বগুড়া সিটি করপোরেশনের নামফলক উন্মোচন এবং পৈতৃক ভিটা গাবতলীর বাগবাড়ীতে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সূচনা করেন। দিনশেষে বগুড়া প্রেসক্লাবের নতুন ভবন উদ্বোধন করে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন এক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।

