পহেলা বৈশাখের উৎসবে যখন পুরো দেশ নতুন বছরকে বরণ করে নিচ্ছে, ঠিক তখনই রাজনীতির মাঠ থেকে এক কড়া সতর্কবার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, স্বৈরাচার পালিয়ে গেলেও তার প্রেতাত্মারা এখনো এই দেশেই রয়ে গেছে এবং তারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পাঁয়তারা করছে।
জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক উপ-নির্বাচনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি বলেন, শেরপুর ও বগুড়ায় অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে, যেখানে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে আসেনি। অথচ একটি বিশেষ চক্র বায়তুল মোকাররমসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় বসে কৃত্রিম উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তারেক রহমানের মতে, যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেখানে শান্তি থাকলেও, দূরে বসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার এই চেষ্টাই প্রমাণ করে যে ‘স্বৈরাচারের ভূত’ এখনো সক্রিয়।
প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “জনসম্পৃক্ত কোনো কর্মসূচি যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।” তিনি অভিযোগ করেন, অতীতেও গণতন্ত্রের নাম নিয়ে একদল মানুষ জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করেছে এবং উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করেছে। সেই গোষ্ঠীটিই এখন আবার বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ড. ইউনূসের আমন্ত্রণে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যখন এই সনদ সই করার ডাক দেওয়া হয়েছিল, তখন বিএনপিই ছিল প্রথম দল যারা এগিয়ে এসেছিল। তারেক রহমান দৃঢ়তার সাথে বলেন, “জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি লাইন ইনশাআল্লাহ আমরা বাস্তবায়ন করব। যারা নির্বাচনের পর সুযোগ বুঝে এই সনদে সই করেছে, তাদের দরদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর কথা তুলে ধরেন। খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষক কার্ডের মতো জনবান্ধব কর্মসূচিগুলোতে যারা বাধা দেবে, তাদের জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিহত করার ঘোষণা দেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, “কাদের ওপর স্বৈরাচারের আছর পড়ছে এবং কারা অরাজকতা তৈরি করতে চাচ্ছে, তাদের চিনে রাখা জরুরি।”
আবেগঘন কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী তার নিজের ও দলের রাজনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরে বলেন, “এই বাংলাদেশই আমাদের শেষ ঠিকানা। এ দেশেই আমরা জন্মেছি, এ দেশেই আমাদের মরতে হবে। বিদেশে আমাদের কোনো ঠিকানা নেই।” তিনি দেশ গড়ার কাজে দল-মত নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং একটি ‘প্রত্যাশিত বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখান।
এর আগে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী টাঙ্গাইলের সন্তোষে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং মোনাজাতে অংশ নেন। মাজার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে জনসভাস্থল পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীদের ঢল নামে, যা পহেলা বৈশাখের আনন্দকে এক রাজনৈতিক সমাবেশে রূপ দেয়।
অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খানসহ মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর টাঙ্গাইলের স্থানীয় রাজনীতিতে যেমন প্রাণসঞ্চার করেছে, তেমনি জাতীয় রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ অবস্থানের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। জনসভা শেষে তিনি আবারও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে অবিচল থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন।

