সকাল থেকেই আকাশটা কিছুটা মেঘলা থাকলেও মানুষের উৎসাহে তার কোনো ছাপ পড়েনি। শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের উপনির্বাচনে আজ সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের এক স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইন যেন উৎসবের রঙ ছড়িয়েছে ভোটকেন্দ্রগুলোর আঙিনায়। রঙিন শাড়ি পরে, ঘরের কাজ সেরে সকাল সকাল ভোট দিতে আসা এই নারীদের চোখেমুখে ছিল নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রত্যাশা।
তবে ভোটারদের এই উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে কিছুটা ছন্দপতন ঘটিয়েছে ভোটগ্রহণের মন্থর গতি। আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেলাতে গিয়ে যান্ত্রিক বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে অনেককে। বিশেষ করে বয়স্ক ভোটার এবং যারা কৃষি কাজের সাথে যুক্ত, তাদের অনেকেরই হাতের ছাপ ডিজিটাল যন্ত্রে শনাক্ত হতে দেরি হওয়ায় লাইনের দৈর্ঘ্য কেবলই বাড়ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক নারী ভোটারকে কিছুটা ক্লান্ত ও বিরক্ত দেখা গেলেও ভোট না দিয়ে বাড়ি ফিরতে নারাজ তারা।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন আজ বেলা ১০টার দিকে ভোটের প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রথম দুই ঘণ্টায় ভোট পড়েছে মাত্র ১১.৩ শতাংশ। এই হার তুলনামূলক কম হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে তিনি ভোটগ্রহণের ধীরগতিকেই দায়ী করেছেন। তবে তার আশা, দুপুরের পর ভোটারদের চাপ আরও বাড়বে এবং সময়ের সাথে সাথে এই জট কেটে যাবে।
নির্বাচনী লড়াইয়ে এবার ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল যেমন শক্ত অবস্থানে আছেন, তেমনি জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মাসুদুর রহমান মাসুদও নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। মাসুদ মূলত তার বড় ভাই প্রয়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের ইমেজকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ-মার্কসবাদী) প্রার্থী মিজানুর রহমানও সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বিকল্প রাজনীতির কথা বলছেন।
শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এবার প্রশাসন কোনো ছাড় দিচ্ছে না। প্রতিটি কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। শুধু সিসিটিভি ক্যামেরাই নয়, এবার দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের পোশাকে ‘বডিওর্ন ক্যামেরা’ও দেখা গেছে—যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁইয়া স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ৩২টি মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। কোথাও সামান্য বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া মাত্রই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং র্যাবের বিপুল সংখ্যক সদস্য পুরো এলাকায় টহল দিচ্ছেন। ১৬ প্লাটুন বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর ৮টি মোবাইল টিম ভোটারদের মনে সাহস জোগাতে কাজ করছে। প্রশাসন জানিয়েছে, দুই উপজেলার ১২৮টি ভোটকেন্দ্রে যাতে চার লক্ষাধিক ভোটার নির্বিঘ্নে আসতে পারেন, সেজন্য তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য ১৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচারিক ক্ষমতা সম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটরা সরাসরি মাঠে কাজ করছেন। ঝিনাইগাতীর একটি কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়ানো এক নারী ভোটার বলেন, “লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভোটটা দিতে পেরে শান্তি পাচ্ছি। পরিবেশ বেশ শান্ত, ভয়ডর লাগছে না।”
শেরপুর-৩ আসনের এই ভোটগ্রহণ শুধু একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনের লড়াই নয়, বরং স্থানীয় মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনের এক বড় সুযোগ। যান্ত্রিক ত্রুটি আর ধীরগতির বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কত শতাংশ মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং বিকেলের শেষে কার গলায় জয়ের মালা ওঠে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে পুরো জনপদ।

